সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা চেষ্টার জবাবে আফগানিস্তানের বহু স্থানে নির্ভুল বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ভোরে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এ তথ্য জানিয়েছেন। অন্যদিকে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে ৩টার দিকে শুরু হওয়া এসব হামলায় কান্দাহারসহ বেশ কয়েকটি এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
পৃথক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ এবং আফগান বার্তাসংস্থা খ্যামা প্রেস এ খবর জানিয়েছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার নিজের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘আত্মরক্ষার সার্বভৌম অধিকার প্রয়োগ করে পাকিস্তান আফগানিস্তানের ১০টি স্থানে নির্ভুল বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এসব স্থানেই (পাকিস্তানে হামলা চেষ্টায় ব্যবহৃত) ওই ড্রোনগুলো উৎক্ষেপণ ও সংরক্ষণ করা হতো।’
অন্যদিকে খ্যামা প্রেস জানিয়েছে, আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার ও খোস্ত প্রদেশের একাধিক স্থানে বৃহস্পতিবার ভোরে দফায় দফায় বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। তালেবান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৩টার দিকে এসব হামলা শুরু হয়। খোস্ত ও কান্দাহারের বেশ কয়েকটি স্থান ছিল হামলার লক্ষ্য।
খোস্তের তালেবান গভর্নরের মুখপাত্র মুস্তাগফার গারবাজ জানান, পাকিস্তানি বিমান গারবাজ জেলার ক্যাম্প গোলান, খোস্ত শহরের আশপাশের এলাকা এবং ইসমাইল খেল ও মান্দোজাই জেলার কয়েকটি স্থানে হামলা চালিয়েছে।
তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগান গণমাধ্যম আরও জানিয়েছে, কান্দাহার শহরের ৯ নম্বর জেলার মরু এলাকাতেও বিমান হামলা চালানো হয়েছে। আফগান কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এসব হামলায় কোনো হতাহত বা উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তাদের এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া পাকিস্তানও হামলার লক্ষ্যবস্তু বা অভিযানের ফলাফল সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ড্রোন ভূপাতিত করে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। সূত্রগুলো জানায়, সশস্ত্র বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সময়মতো সব আটটি ড্রোন শনাক্ত করে এবং সেগুলোকে ভূপাতিত করে। ফলে আফগানিস্তান থেকে ড্রোন হামলার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
এর মধ্যে চারটি ড্রোন তোরখাম সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় এবং বাকি চারটি কোহাটের কাছের পার্বত্য এলাকায় ভূপাতিত করা হয়।
বৃহস্পতিবারের বিবৃতিতে আতাউল্লাহ তারার বলেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর চালানো এসব হামলা ছিল ‘পরিকল্পিত, নির্ভুল, নিয়ন্ত্রিত ও আনুপাতিক’। পাকিস্তানে হামলার চেষ্টার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে শনাক্ত করা সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যেই এসব হামলা কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
তারার আরও বলেন, ২৩ সেপ্টেম্বর আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানে ‘ইচ্ছাকৃত ও বেআইনিভাবে ড্রোন অনুপ্রবেশের’ তীব্র নিন্দা জানায় পাকিস্তান। তিনি বলেন, ‘এটি পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং গুরুতর ও অগ্রহণযোগ্য আগ্রাসন।’
তিনি আরও বলেন, আফগান ভূখণ্ডে সন্ত্রাসী আস্তানা ও তাদের সহযোগী নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়ে পাকিস্তান বছরের পর বছর ধরে আফগান তালেবান সরকার ও তাদের সঙ্গে যোগাযোগকারী ব্যক্তিদের কাছে গুরুতর উদ্বেগের কথা জানিয়ে আসছে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, এসব নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ নেয়ার পরিবর্তে তালেবান সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বৈরী ড্রোন অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার পথ বেছে নিয়েছে। তিনি বলেন, পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনুপ্রবেশকারী সব ড্রোন শনাক্ত, অনুসরণ ও ধ্বংস করেছে। ফলে সেগুলো নির্ধারিত কোনো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই হামলার চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়।
তারার বলেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কিংবা আফগান তালেবান সরকার নিজে—যেই হোক না কেন, আফগান ভূখণ্ড থেকে চালানো কোনো হামলা পাকিস্তান মেনে নেবে না বা সহ্য করবে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের যেকোনো লঙ্ঘনের তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব দেয়া হবে। আফগান তালেবানের হুমকি, অস্বীকার কিংবা দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা বাস্তবতা পরিবর্তন করতে পারবে না এবং নিজেদের ভূখণ্ড, জনগণ ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় পাকিস্তানের সহজাত অধিকারও সীমিত করতে পারবে না।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালে আফগান তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে সীমান্তপার হয়ে সন্ত্রাসী হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালাতে যাতে দেশটির ভূখণ্ড সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে ইসলামাবাদ বারবার কাবুলকে আহ্বান জানিয়েছে। পাকিস্তানের দাবি, দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার জন্য দায়ী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আফগান তালেবান কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এসএ