সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার অঙ্গীকার করেছেন। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক ফোন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দেশে ফেরার প্রশ্নটি ‘কখন’ নয়, বরং কীভাবে দেশে ফিরবেন সেটিই মূল বিষয়। তিনি বলেন, দেশে ফিরে তিনি আইনি পরিণতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
এনডিটিভির ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে তিনি জানান।
শেখ হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রত্যাখ্যান করে এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অন্যায্য বলে দাবি করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, দেশে ফিরলে কারাবাসসহ আইনি পরিণতি মোকাবিলা করতে তিনি প্রস্তুত। বিচারপ্রক্রিয়ায় নিজের আইনি অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সারা দেশে অন্তত ছয় শত মামলা রয়েছে । এসব মামলার মধ্যে বিভিন্ন থানায় দায়ের করা ফৌজদারি মামলাও রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে করা অন্যান্য মামলার বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি মামলার রায়ের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয় না এবং আইন অনুযায়ী সেগুলোর কার্যক্রম চলতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত বছরের ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন।
তবে মামলার রায় নিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য ভিন্ন। এনডিটিভিকে তিনি বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ ও ট্রাইব্যুনাল মামলায় উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে।
মামলাটিতে শেখ হাসিনাকে একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য একটি অভিযোগে স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষ প্রাকৃতিক মৃত্যু পর্যন্ত কারাদণ্ডের সাজাটিও মৃত্যুদণ্ডে উন্নীত করার আবেদন করে আপিল বিভাগে যায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে যান এবং এরপর থেকে সেখানেই অবস্থান করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে আবারও আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করে।
এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ব্যাপারে নিজের আগ্রহের কথা জানালেও ভারত বা বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে কোনো সরকারি বা গোপন যোগাযোগ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য দেননি।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন। তাঁর দাবি, দলটির সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন এবং সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ চলছে। তিনি আওয়ামী লীগকে আবারও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করার কথা বলেন এবং গণতান্ত্রিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য তুলে ধরেন।
বাংলাদেশে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হুমকি রয়েছে বলেও সাক্ষাৎকারে দাবি করেন শেখ হাসিনা। এ ধরনের হুমকি মোকাবিলায় গোয়েন্দা সক্ষমতা, আইন প্রয়োগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, উগ্রবাদ সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন তাঁর বিরুদ্ধে সারা দেশে শত শত মামলা রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাসংক্রান্ত মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে।
এফএস