যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ অব্যাহত রাখলে পারস্য উপসাগরজুড়ে সামুদ্রিক বিধিনিষেধ এলাকা গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাই মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) এ সতর্কবার্তা দেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রেজাই বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অর্থনৈতিক যুদ্ধের জবাব দেওয়া হবে পারস্য উপসাগরজুড়ে একটি সামুদ্রিক ‘এক্সক্লুশন জোন’ বা বিধিনিষেধ এলাকা তৈরির মাধ্যমে। এই এলাকা মার্কিন নৌ-অবরোধের সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
রেজাই আরও বলেন, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ঘিরে ইরানের সামরিক কৌশল ও কার্যক্রমে ‘মৌলিক পরিবর্তন’ আনা হয়েছে। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে ইতোমধ্যে একটি ‘স্পষ্ট সতর্কবার্তা’ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে সোমবার রেজাই জানিয়েছিলেন, ইরান হরমুজ প্রণালির বাইরে পারস্য উপসাগরের একটি অংশে নতুন ‘রেস্ট্রিকটেড’ বা সীমিত প্রবেশাধিকার এলাকা ঘোষণা করবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এলাকাটি মার্কিন নৌ-অবরোধের অবস্থান থেকে শুরু হয়ে উপসাগরের আরও কিছু অংশে বিস্তৃত হতে পারে।
এই এলাকায় প্রবেশকারী যেকোনো জাহাজকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করা হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলের জন্য ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি নতুন নৌ-করিডর তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
রেজাইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উন্নত কাসেম বসির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে সক্ষমতার পরীক্ষা বা হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা অন্তত ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার। এতে উন্নত নির্ভুলতা, গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রতিরোধের মতো বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলেও দাবি করেছে তেহরান। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে সব তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রেজাইয়ের বক্তব্যে আরও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, তেহরান এখন শুধু হামলার জবাব দেওয়ার পরিবর্তে সম্ভাব্য হুমকি তৈরি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার মতো আরও আক্রমণাত্মক সামরিক নীতি গ্রহণ করছে।
পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ফলে এই এলাকায় জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে এসেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার প্রণালিটি দিয়ে মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ পার হয়েছে; আগের দিন এ সংখ্যা ছিল আটটি।
এই পরিস্থিতির প্রভাব আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও দেখা যাচ্ছে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৭ দশমিক ৪৯ ডলার এবং মার্কিন প্রায় ৯২ দশমিক ৯২ ডলারে উঠেছে।
রেজাইয়ের সর্বশেষ হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। দুই পক্ষের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নৌ-অবরোধ এবং তেল পরিবহনকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
তেহরানের নতুন সামুদ্রিক বিধিনিষেধ বাস্তবে কতটা বিস্তৃত হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে এমন কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র- ইরান সংঘাত নয়, বিশ্বের তেলবাজার, আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
ইরানের এই হুঁশিয়ারিকে তাই শুধু সামরিক বার্তা হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে তেল ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে পাল্টা কৌশলগত চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
-এফএস