কাগজে জমি আছে, আছে খতিয়ান ও মালিকানার প্রমাণপত্র। অথচ সেই জমিতে যেতে পারেন না কৃষকেরা। বছরের পর বছর ধরে এমনই বাস্তবতার শিকার ফেনীর পরশুরামের মুহুরীর চরের শতাধিক বাংলাদেশি কৃষক।
১৯৪৭ সালের পর থেকে মুহুরীর চরের প্রায় দুই কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা নিয়ে চলে আসছে বিরোধ। দীর্ঘ সময়ের মধ্যে হয়েছে ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব স্থলসীমান্ত চুক্তি, ২০১১ সালের প্রটোকল এবং দুই দেশের একাধিক যৌথ জরিপ। ২০১৩-১৪ সালের যৌথ জরিপের পর সীমারেখা চিহ্নিত করতে বসানো হয় ৪৪টি অস্থায়ী কাঠের খুঁটি। কিন্তু আজও নির্মাণ হয়নি স্থায়ী সীমান্ত পিলার।
সরকারি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ মাঠ মৌসুমে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে মুহুরীর চরে জরিপ চালিয়ে সীমারেখা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ২০১৪ সালের ১৫ থেকে ১৮ জানুয়ারি দুই দেশের জরিপ বিভাগ বিজিবি ও বিএসএফের সহযোগিতায় যৌথ জরিপ পরিচালনা করে। তখন অস্থায়ী খুঁটির জায়গায় পরবর্তীতে স্থায়ী পিলার নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
মুহুরীর চরের মোট আয়তন প্রায় ৯২ দশমিক ১৪ একর বলে বিভিন্ন সরকারি ও প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। ২০১১ সালের প্রটোকল-সংক্রান্ত তথ্যে এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশ ৭১ দশমিক ৯৪ একর এবং ভারতের অংশ ২০ দশমিক ২০ একর বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কাগজপত্রে নিজেদের মালিকানা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা ওই জমিতে যেতে পারছেন না। ফলে বছরের পর বছর বন্ধ রয়েছে চাষাবাদ। অনেক পরিবারের জমি থাকলেও বাস্তবে তা থেকে কোনো আয় করতে পারছেন না তাঁরা।
স্থানীয়দের দাবি, ৪৪টি অস্থায়ী খুঁটির অধিকাংশই এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। খুঁটিতে লাগানো জরিপ নম্বরের লোহার পাতও মরিচা ধরে বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে স্থায়ী সীমান্ত চিহ্ন না থাকায় সীমারেখা নিয়ে মাঠপর্যায়ে জটিলতা থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে, মুহুরীর চরের সীমান্ত বিরোধ শুধু জমির মালিকানা ও কৃষকের ভোগদখলের বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থায়ী সীমান্ত চিহ্ন না থাকায় সীমান্ত নিরাপত্তা, চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়েও ঝুঁকি রয়েছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৯ সালের ২২ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মুহুরীর চরকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বিডিআর ও বিএসএফের মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে সেখানে বাংলাদেশি নাগরিক আহত ও আটকের ঘটনাও ঘটেছে।
মুহুরীর চরের জমির মালিকদের দাবি, সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি নিজেদের জমিতে নিরাপদে যাতায়াত ও চাষাবাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের প্রত্যাশা, সরকারের কার্যকর উদ্যোগে দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধান হবে।
আরএন