মাত্র কয়েক বছরের অভিনয়জীবন। ২৭টি চলচ্চিত্র। আর অসংখ্য দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে যাওয়া একটি নাম- সালমান শাহ। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর আকস্মিক মৃত্যু বাংলা চলচ্চিত্রে যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তিন দশক পরও তা পূরণ হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতি দর্শকের ভালোবাসা আরও দৃঢ় হয়েছে।
সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে এবারও তাঁকে স্মরণ করছে চলচ্চিত্রাঙ্গন ও তাঁর ভক্তরা। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) আয়োজন করেছে তিন দিনব্যাপী উন্মুক্ত সিনেমা প্রদর্শনীর। ৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর প্রতিদিন বিকেল ৪টায় বিএফডিসির ভিআইপি প্রজেকশন হলে দেখানো হবে তাঁর অভিনীত জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। প্রথম দিন ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ৭ সেপ্টেম্বর ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ এবং ৮ সেপ্টেম্বর প্রদর্শিত হবে ‘তোমাকে চাই’।
একজন প্রয়াত নায়কের স্মরণে এমন আয়োজন শুধু তাঁর চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ নয়; একই সঙ্গে এটি নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে সালমান শাহকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ারও একটি সুযোগ।
ইমন থেকে সালমান শাহ
সালমান শাহর প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে জন্ম তাঁর। ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চলচ্চিত্রে আসার আগে টেলিভিশন নাটক, মিউজিক ভিডিও ও বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেন।
হানিফ সংকেতের উপস্থাপনায় ‘কথার কথা’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ মিউজিক ভিডিওতে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের নজরে আসেন ইমন। পরে ‘পাথর সময়’সহ কয়েকটি নাটকেও অভিনয় করেন।
তবে তাঁর ভাগ্য বদলে যায় বড় পর্দায় অভিষেকের পর।
১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। তাঁর বিপরীতে ছিলেন মৌসুমী। একই সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে গায়ক আগুনেরও।
প্রথম চলচ্চিত্রেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান সালমান শাহ। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
কয়েক বছরে তৈরি করেছিলেন নিজস্ব এক জগৎ
‘অন্তরে অন্তরে’, ‘দেনমোহর’, ‘তোমাকে চাই’, ‘বিক্ষোভ’, ‘বিচার হবে’, ‘চাঁদ থেকে পাওয়া’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘জীবন সংসার’, ‘মহা মিলন’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘সত্যের মৃত্যু নাই’, ‘সুজন সখী’, ‘তুমি আমার’, ‘প্রিয়জন’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘প্রেম পিয়াসী’ ও ‘বুকের ভিতর আগুন’—একটির পর একটি সিনেমায় নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি।
শুধু অভিনয় নয়, সালমান শাহর ব্যক্তিত্ব ও ফ্যাশনও তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল। পোশাক, চুলের স্টাইল, সংলাপ বলার ধরন- সবকিছুতেই ছিল সময়ের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে থাকার ছাপ।
শাবনূরের সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। এই জুটির বেশ কয়েকটি সিনেমা বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় এবং নব্বইয়ের দশকের চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত জুটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় তাঁরা।
প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, সালমান শাহ তাঁর স্বল্প অভিনয়জীবনে ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। টেলিভিশনেও তাঁর বেশ কিছু নাটক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল।
৬ সেপ্টেম্বরের সেই সকাল
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। মাত্র ২৫ বছর বয়সে নিউ ইস্কাটনের বাসায় অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় সালমান শাহকে। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে চলচ্চিত্রাঙ্গন ও দর্শকের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। যে নায়ক তখন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়ে, তাঁর এমন আকস্মিক চলে যাওয়া মেনে নিতে পারেননি অনেকেই।
কিন্তু শোকের সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসে নানা প্রশ্ন।
তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেন বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরবর্তীতে পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যা হিসেবে তদন্তের দাবি জানানো হয়।
আত্মহত্যা নাকি হত্যা- দীর্ঘদিনের বিতর্ক
সালমান শাহর মৃত্যুর কারণ নিয়ে শুরু থেকেই দুই ধরনের বক্তব্য সামনে এসেছে। পূর্ববর্তী তদন্তে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্যদিকে তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
এই বিরোধপূর্ণ অবস্থানের কারণে সালমান শাহর মৃত্যু বাংলাদেশের বিনোদনজগতের অন্যতম আলোচিত রহস্য হয়ে আছে।
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ উঠেছে। তাঁর পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠজন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্যও এসেছে গণমাধ্যমে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এর পরদিন ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক আশরাফুল হক ওরফে ডনসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকেও আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে সালমান শাহকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে মামলাটি বিচারাধীন এবং আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
নতুন করে আলোচনায় ডন
সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলঅভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে গ্রেপ্তারের পর মামলাটি আবারও আলোচনায় আসে।
বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। তদন্ত সংস্থার আবেদনের পর আদালত তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন।
ডনের রিমান্ডকে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে মানববন্ধন করেন সালমান শাহর ভক্তরা। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিনের এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হোক।
তবে গ্রেপ্তার বা রিমান্ড মানেই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে অভিযোগের সত্যতা।
কেন আজও এতটা প্রাসঙ্গিক সালমান শাহ?
সালমান শাহর মৃত্যুর তিন দশক পরও তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর সিনেমা নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছেছে।
এর একটি কারণ তাঁর অভিনয়ের স্বাতন্ত্র্য। আরেকটি কারণ, তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোতে নব্বইয়ের দশকের তরুণ প্রজন্ম নিজেদের আবেগ, প্রেম, স্বপ্ন ও হতাশার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছিল।
তাঁর সঙ্গে দর্শকের সম্পর্কটা তাই শুধু নায়ক-দর্শকের সম্পর্ক ছিল না। অনেকের কাছে সালমান ছিলেন কৈশোরের স্মৃতি, প্রথম সিনেমা দেখার আনন্দ কিংবা কোনো পুরোনো গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক টুকরো আবেগ।
এই কারণেই তিন দশক পরও তাঁর সিনেমা টেলিভিশনে প্রচার হলে দর্শক থেমে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর জন্মদিন কিংবা মৃত্যুবার্ষিকীতে ভক্তরা আয়োজন করেন নানা কর্মসূচির।
অপূর্ণ থেকে গেল অনেক সম্ভাবনা
সালমান শাহর ক্যারিয়ার যখন গতি পাচ্ছিল, ঠিক তখনই থেমে যায় তাঁর পথচলা।
তিনি বেঁচে থাকলে বাংলা চলচ্চিত্রে আরও কত চরিত্রে তাঁকে দেখা যেত, কত নতুন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করতেন, কীভাবে বদলে যেত তাঁর অভিনয়ের ধরন—এসব প্রশ্নের উত্তর আর কখনো জানা যাবে না।
তবে তাঁর অকালমৃত্যু তাঁর অর্জনকে মুছে দেয়নি। বরং স্বল্প ক্যারিয়ারে তৈরি করা কাজগুলোই তাঁকে পরিণত করেছে বাংলা চলচ্চিত্রের স্মরণীয় এক নামের মধ্যে।
পর্দায় ফিরবেন প্রিয় নায়ক
৬ সেপ্টেম্বর থেকে বিএফডিসির প্রজেকশন হলে আবার বড় পর্দায় দেখা যাবে সালমান শাহকে।
হয়তো কোনো তরুণ দর্শক প্রথমবার দেখবে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। কেউ আবার বহু বছর পর প্রিয় সিনেমার সামনে বসবে। পর্দায় আলো জ্বলবে, শুরু হবে সিনেমা—আর ফিরে আসবে সেই পরিচিত মুখ।
সালমান শাহ আজ আর নেই। কিন্তু তাঁর অভিনীত সিনেমাগুলো আছে, তাঁর গান আছে, তাঁর ছবি আছে, আর আছে দর্শকের স্মৃতি।
তিন দশক পরও তাই সালমান শাহকে ঘিরে ভালোবাসা থামেনি।
কারণ কিছু নায়ক শুধু সিনেমায় অভিনয় করেন না- তাঁরা একটি প্রজন্মের স্মৃতির অংশ হয়ে যান। সালমান শাহ তেমনই একজন।
৬ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই শোকের পাশাপাশি ফিরে আসে কৃতজ্ঞতাও- বাংলা চলচ্চিত্রকে এত অল্প সময়ে এতটা ভালোবাসা দেওয়ার জন্য।
সালমান শাহ নেই, কিন্তু তাঁর পর্দার আলো এখনো নিভে যায়নি।
-টিএস