রাস্তার ওপর রাখা হয়েছে পাথর। দূর থেকে মনে হচ্ছে, এগুলো দিয়েই নির্মাণ করা হচ্ছে গাইড ওয়াল। কিন্তু কাছে গেলেই চোখ কপালে ওঠার মতো দৃশ্য। পাথরের নিচে লুকানো খোয়ার রাবিশ, আর সেই রাবিশ দিয়েই চলছে ঢালাইয়ের কাজ। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) আওতায় নির্মাণাধীন একটি সড়কে এমন অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের বারবার অভিযোগ এবং জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরও এভাবেই চলছে সড়কের নির্মাণকাজ।
ঘটনার সত্যতা মুঠোফোনে স্বীকার করেছেন বর্তমান ঠিকাদার সোবহান। তিনি বলেন, “আপনারা যা দেখছেন, তা সত্য। পাথরের নিচে খোয়া রেখে খোয়া দিয়েই কাজ করা হচ্ছে।” তবে তাঁর দাবি, গোয়ালন্দ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নির্দেশেই এমন কাজ করা হচ্ছে। “তারা না বললে আমরা এ কাজ করার সাহস পেতাম না,” বলে জানান তিনি। এ সময় তিনি এই প্রতিবেদককে একসঙ্গে চা খাওয়ারও প্রস্তাব দেন।
তবে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “আজ বন্ধের দিন হওয়ার সুযোগে তারা এই অপকর্ম করছে।” তাঁর নির্দেশে এমন কাজ হচ্ছে—এমন অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের নতুনপাড়া এলাকায় পৌরসভার ময়লা ফেলার ডাম্পিং স্টেশনে যাতায়াতের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি সড়ক। সড়ক নির্মাণে অনিয়ম এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি বারবার জানালেও এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর সহযোগিতায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করে চলেছে। এছাড়া কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারের কাছ থেকে কম মূল্যে প্রকল্পটি কিনে নেওয়ার বিষয়টিও স্থানীয়দের কাছে ‘ওপেন সিক্রেট’। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই সড়ক ও প্যালাসাইডিং (গাইড ওয়াল) নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে রাজবাড়ীর সুবাহান নামে এক স্থানীয় ঠিকাদার কাজটি পরিচালনা করছেন। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি নির্মাণকাজে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করছেন।
গত ৪ মে ‘২/৩ নম্বর ইট দিয়ে কাজ হচ্ছে’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) হস্তক্ষেপে নামমাত্র ইট পরিবর্তন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাঁদের দাবি, সবাইকে ইট পরিবর্তন দেখানো হলেও পরে সেই পুরোনো ইট দিয়েই কাজ করা হয়েছে।
এরপর গত ১৫ ও ১৬ জুলাই গাইড ওয়াল ও সড়ক নির্মাণে অনিয়ম নিয়ে প্রায় সব জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। সে সময় কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও পরে আবার সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর হস্তক্ষেপেই কাজ পুনরায় শুরু করা হয়। তাঁদের ভাষায়, “এখানে চুরি নয়, যেন পুকুর চুরি হচ্ছে।”
প্রকল্পটির কাজ চলতি বছরের এপ্রিল মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েক দফা সংবাদ প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
গত বুধবার (২৬ জুলাই) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাথর নামিয়ে রাখা হয়েছে। তবে ঢালাইয়ের স্থানে গিয়ে দেখা যায়, খোয়ার রাবিশ ব্যবহার করে ঢালাই দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ নিম্নমানের খোয়া রেখে তার ওপর পাথর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় পাথর দিয়েই ঢালাইয়ের কাজ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এত বড় অনিয়ম চললেও সড়ক নির্মাণের সময় স্থানীয় প্রকৌশল কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে সেখানে দেখা যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকৌশল কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “ওখানে যাওয়ার উপায় নেই। যিনি কাজ পেয়েছেন, তাঁর কাছ থেকে জোর করে কাজ নিয়ে একজন কাজ করছেন। তিনি নিজেকে মন্ত্রীর লোক পরিচয় দিয়ে জোর করে কাজ করছেন। তিনি আমাদের কথা শোনেন না। তাই অফিসের কেউ সেখানে যায় না।”
স্থানীয় বাসিন্দা ইমরান হোসেন বলেন, “পুরো কাজটাই নিয়মবহির্ভূতভাবে করা হয়েছে। রাস্তার পিচ উঠে যাচ্ছে। শুনেছিলাম, খোয়া ও পাথর দিয়ে মজবুত ভিত্তি করা হবে। কিন্তু সেখানে বেশি বালু ব্যবহার করা হয়েছে। গাইড ওয়ালেও শুধু ইটের ওপর সিমেন্ট-বালুর প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। কোথাও রড ব্যবহার করা হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “প্রথমে রাবিশ রেখে তার ওপর পাথর দেওয়া হয়েছে। পরে সেই রাবিশ দিয়েই কাজ করা হচ্ছে। এ কাজে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা সহযোগিতা করছেন।”
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা রাজিব সরদার বলেন, “রাস্তার কাজের শুরু থেকেই অনিয়ম হয়েছে। দুই নম্বর ইট ব্যবহার করা হয়েছে। নির্মাণের পর থেকেই রাস্তার ওপরের পিচ উঠে যাচ্ছে। এছাড়া গাইড ওয়ালে ফাটল ধরেছে। কোনো কাজই ভালো হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “এলাকাবাসী বারবার বাধা দিলেও তাঁদের কথা শোনা হয়নি। বরং ভয়ভীতি দেখিয়ে কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের সিডিউল অনুযায়ী গাইড ওয়াল নির্মাণে নিচ থেকে ৫০০ মিলিমিটার উচ্চতা পর্যন্ত ৩৭৬ মিলিমিটার পুরু ইটের গাঁথুনি এবং পরবর্তী ৫০০ মিলিমিটার অংশে ২৫০ মিলিমিটার পুরু গাঁথুনি করার কথা। এছাড়া প্রতি ৩ মিটার অন্তর ১৫০×১৫০ মিলিমিটার প্রি-কাস্ট আরসিসি পোস্ট এবং ২০০×১৫০ মিলিমিটার ক্যাপিং বিম নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে এসব নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।
এছাড়া সিডিউল অনুযায়ী প্যালাসাইডিং নির্ধারিত দূরত্বে করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনেক কম দূরত্বে নির্মাণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তাঁদের আরও অভিযোগ, কার্পেটিংয়ের আগে নিয়ম অনুযায়ী প্রাইম কোট ব্যবহার না করে অল্প পরিমাণ ট্যাক কোট প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে ইতোমধ্যেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে যেতে শুরু করেছে।
স্থানীয়রা জানান, রাস্তার পাশেই মরা পদ্মা নদী থাকায় এখানে শক্তিশালী প্যালাসাইডিং অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নিম্নমানের নির্মাণের কারণে বর্ষা মৌসুমেই নতুন সড়কটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর আগেও একই স্থানে নির্মিত একটি সড়ক এক বছরের মধ্যেই ভেঙে গিয়েছিল বলে জানান তাঁরা।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল হুদা বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৌর ইঞ্জিনিয়ার এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলীকে জানানো হয়েছে। এখানে নিয়মের বাইরে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। অনিয়ম হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এসআই/আরএন