কৃষকদের কাছে নিরবচ্ছিন্ন ও সুষ্ঠুভাবে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার ডিলার সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত)’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিদপ্তর থেকে রোববার (৯ আগস্ট) একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতিটি উপজেলায় ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সার বিতরণের জন্য ন্যূনতম ৯ জন ডিলার রাখতে হবে। তবে সংশ্লিষ্ট জেলার সার চাহিদা ও কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ বিবেচনায় প্রয়োজনে ডিলারের সংখ্যা বাড়ানো যাবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও জেলা ডিলার সমবায়ের সুপারিশের ভিত্তিতে জেলা কমিটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। একজন ব্যক্তি একাধিক সার ডিলারশিপের মালিক হতে পারবেন না।
আবেদন পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে সুপারিশ পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে নীতিমালায়। নতুন ডিলারদের নিজস্ব গুদাম, গোডাউন এবং সার বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় সার্ভিস সেন্টার থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিদ্যমান ডিলারদের লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার চাহিদা, জেলাভিত্তিক কোটা এবং নীতিমালার শর্ত পূরণের বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। অফিস আদেশে আরও বলা হয়েছে, সার উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি ডিলার বা উপজেলা পর্যায়ে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি, কৃষকদের স্বার্থে জেলা কমিটি ডিলারদের জন্য ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করবে। নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো ডিলার নীতিমালা লঙ্ঘন করলে বা নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গ করলে তার ডিলারশিপ বাতিল করা হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন জমা দিতে পারবেন। নীতিমালার বিস্তারিত তথ্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।
আদেশে বলা হয়েছে, সার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কৃষকদের কাছে সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই সংশোধিত নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ নীতিমালার পরে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এর আলাদা ডিলার প্রথা বাতিল হয়ে একটি সমন্বিত ডিলার ব্যবস্থা চালু হবে।
নতুন নীতিমালায় ডিলার নিয়োগে স্থানীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় ডিলারের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একজন ডিলারের অধীনে সর্বোচ্চ তিনটি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র রাখার বিধান করা হয়েছে।
এক ডিলারের সর্বোচ্চ তিন বিক্রয়কেন্দ্র
সার বিক্রিতে ডিলারদের পাশাপাশি বিক্রয় প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। প্রতিটি ডিলারের অধিক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিনটি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থাকবে। এর মধ্যে একটি বিক্রয়কেন্দ্র ডিলার নিজে পরিচালনা করবেন। অন্য দুটি কেন্দ্র ডিলারের মনোনীত সার বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
তবে বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্থানীয় বাসিন্দাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রতিনিধিকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দারাই অগ্রাধিকার পাবেন।
বিক্রয় প্রতিনিধির নিয়োগ ও কার্যক্রম উপজেলা বা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির অনুমোদনের আওতায় থাকবে।
ডিলার হতে ১০ লাখ টাকার ব্যাংক সক্ষমতা
নতুন নীতিমালায় ডিলার হওয়ার যোগ্যতার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু শর্ত রাখা হয়েছে। আবেদনকারীকে আর্থিকভাবে সক্ষম হতে হবে এবং কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা ব্যাংক সক্ষমতার সাম্প্রতিক সনদ থাকতে হবে। এ ছাড়া আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে, ট্রেড লাইসেন্স থাকতে হবে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও চলাফেরায় সক্ষম হতে হবে। ডিলারের নিজ মালিকানাধীন অথবা ভাড়ায় নেওয়া সংশ্লিষ্ট এলাকায় কমপক্ষে ৫০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে।
গুদামটি সার সংরক্ষণের উপযোগী হতে হবে। খাদ্যদ্রব্যের দোকান, রেস্তোরাঁ, গো-খাদ্য, মাছের খাবার বা সবজির দোকানের সঙ্গে একই গুদামে সার সংরক্ষণ করা যাবে না। সারের গুদামে বীজও সংরক্ষণ করা যাবে না।
সরকারি চাকরিজীবী ও একই পরিবারের একাধিক সদস্যের সুযোগ নেই
নীতিমালায় সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বা জনপ্রতিনিধিদের সার বিক্রয় প্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিও ডিলার বা বিক্রয় প্রতিনিধি হতে পারবেন না। পরিবারের একজন ডিলারশিপ বা বিক্রয় প্রতিনিধিত্বে থাকলে অন্য সদস্য এ ধরনের নিয়োগের জন্য আবেদন করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য হিসেবে বাবা, মা, স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান, সন্তানের স্ত্রী, সন্তানের সন্তান, অবিবাহিত কন্যা এবং নির্ভরশীল ভাই-বোনকে বিবেচনা করা হয়েছে।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থাকলে অযোগ্য
এরআগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কোনো ব্যক্তির সার ডিলারশিপ বাতিল হয়ে থাকলে তিনি নতুন করে ডিলারশিপের জন্য আবেদন করতে পারবেন না। ব্যবসায় অনিয়ম, জালিয়াতি বা অন্য কোনো আইনে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিও অযোগ্য বিবেচিত হবেন। তবে ফৌজদারি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর সাজা শেষ হলে দুই বছর পার হওয়ার পর আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া, সার ব্যবসা পরিচালনা-সংক্রান্ত অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবেও নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগ পেতে পারবেন না।
ডিলার হতে দিতে হবে ৩ লাখ টাকা জামানত
নির্বাচিত ডিলারকে চুক্তি সম্পাদনের আগে ৩ লাখ টাকা জামানত দিতে হবে। নির্বাচিত হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তফসিলভুক্ত ব্যাংক থেকে পে-অর্ডার বা ডিমান্ড ড্রাফটের মাধ্যমে এই অর্থ জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির অনুকূলে জমা দিতে হবে। অন্যদিকে ডিলারের মনোনীত বিক্রয় প্রতিনিধিকে ৫০ হাজার টাকা জামানত দিতে হবে। আবেদন করার সময়ও অর্থ জমা দিতে হবে। নীতিমালা অনুযায়ী, ডিলারশিপের আবেদনের সঙ্গে ২ হাজার টাকা আবেদন ফি এবং ১০ হাজার টাকা আনুষঙ্গিক/আর্নেস্টমানি জমা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
দুই বছর পরপর ডিলারশিপ নবায়ন
নিয়োগ পাওয়ার পর প্রতি দুই বছর অন্তর ডিলারশিপ নবায়ন করতে হবে। একইভাবে বিক্রয় প্রতিনিধির নিয়োগও দুই বছর পরপর নবায়ন করার বিধান রয়েছে। নবায়নের ক্ষেত্রে ডিলারের কার্যক্রম, সার বিতরণ, গুদাম ও অন্যান্য শর্ত পালনের বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবায়ন না করলে ডিলারশিপ বা বিক্রয় প্রতিনিধিত্ব সাময়িকভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে।
মনিটরিংয়ে জেলা-উপজেলা কমিটি
সার বিতরণব্যবস্থা তদারকিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি থাকবে। জেলা পর্যায়ের কমিটির সভাপতি হবেন জেলা প্রশাসক। কমিটিতে পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কৃষি কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা থাকবেন। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন এবং কৃষকদের প্রতিনিধিও কমিটিতে থাকবেন।
উপজেলা পর্যায়ের কমিটির সভাপতি থাকবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এই কমিটি ডিলারদের সার বিতরণ, কৃষকের চাহিদা, মজুত, মূল্য পরিস্থিতি এবং সার সরবরাহের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করবে। সার সরবরাহে কোনো ইউনিয়ন বা পৌরসভায় ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিলে আন্তঃউপজেলা বা আন্তঃইউনিয়ন স্থানান্তরের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
অনিয়ম হলে ডিলারশিপ বাতিল
নীতিমালায় সার নিয়ে অনিয়ম ও অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে তা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ডিলারশিপ বাতিলসহ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
সিটি করপোরেশন এলাকায় ডিলারের মনোনীত বিক্রয় প্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তার জামানত বাজেয়াপ্ত, আইডি কার্ড বাতিল ও নিয়োগ বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় কমিটির মাধ্যমে চূড়ান্ত নিয়োগ
ডিলার নিয়োগে স্থানীয় পর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি ‘সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি’ থাকবে। কৃষি মন্ত্রণালয়, বিসিআইসি, বিএডিসি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে এ কমিটি গঠিত হবে।
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ করা আবেদনগুলো পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় কমিটি ডিলার নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।
টিআইএস