এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা এবার একাদশে ভর্তি যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। দেশের কলেজ ও মাদরাসাগুলোতে একাদশ শ্রেণিতে প্রায় ২৫ লাখ আসন রয়েছে। অথচ এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। সবাই একাদশে ভর্তি হলেও প্রায় সাড়ে ১৩ লাখেরও বেশি আসন ফাঁকা পড়ে থাকবে।
সোমবার (১০ আগস্ট) দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মোর্চা বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান এ তথ্য জানিয়েছেন।
অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, ২০২৫ সালে যত শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল তাদের তুলনায় ২০২৬ সালে ভর্তির ক্ষেত্রে আসন সংখ্যা কিছু বেশি শূন্য থাকবে। সারাদেশে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ। গতবার ভর্তি হয়েছিল মোট আসনের ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। বাকি ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ আসন ফাঁকা ছিল। এ বছর পাসের হার আরেকটু কমেছে। সে ক্ষেত্রে আসনসংখ্যা আরেকটু বেশি শূন্য থাকবে।
ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান জানান, এবারও একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম আগের মতোই চলবে। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ এবং মেধা ও পছন্দক্রমের ভিত্তিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
‘ভালো’ কলেজে ভর্তিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলো এবং কিছু জেলায়ও নামি কলেজ রয়েছে। মূলত এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীদের টার্গেট থাকে এসব নামি কলেজে ভর্তি হওয়া। তারা পছন্দক্রমে নামি কলেজগুলোর নাম দিয়ে থাকে। এতে ঘুরেফিরে হাতেগোনা কিছু কলেজে ভর্তির আবেদন বেশি পড়ে। সেই কলেজগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তীব্র হয়।
ঢাকা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় জিপিএ-৫ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীও একাধিকবার আবেদন করেও কলেজ পায় না। এর কারণ তারা বারবার একটি বা দুটি কলেজ পছন্দ দেয়। কিন্তু ওই কলেজে দেখা যায়, সবই জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী আবেদন করেছে। এমনকি জিপিএ-৫ পাওয়াদের মধ্যে বিষয়ভিত্তিক নম্বরে এগিয়ে থাকারা শেষ পর্যন্ত সেখানে ভর্তির সুযোগ পায়। সেজন্য শিক্ষার্থীদের কমপক্ষে ৫টি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজে পছন্দক্রম দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বোর্ডের এ কর্মকর্তা।
ভর্তি ফি কত, কোন কলেজগুলোতে খরচ বেশি
সম্প্রতি বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি একাদশে ভর্তি নিয়ে একটি বৈঠক করেছে। সেখানে আগের মতোই এসএসসির ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ভর্তি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এলাকাভেদে ভর্তি ফি ও অন্যান্য খরচও আগের মতোই থাকতে পারে।
ঢাকা বোর্ড সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের একাদশে ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী- এমপিওভুক্ত কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনে ৫ হাজার টাকা, মেট্রোপলিটন (ঢাকা ছাড়া) বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনে ৩ হাজার টাকা, জেলায় ২ হাজার টাকা এবং উপজেলা ও মফস্বলে দেড় হাজার টাকা।
নন-এমপিওভুক্ত কলেজের ক্ষেত্রে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বাংলা ভার্সনে সাড়ে ৭ হাজার টাকা, ইংরেজি ভার্সনে সাড়ে ৮ হাজার টাকা, মেট্রোপলিটন (ঢাকা ছাড়া) বাংলা ভার্সনে ৫ হাজার টাকা ও ইংরেজি ভার্সনে ৬ হাজার টাকা।
এছাড়া নন-এমপিও জেলায় বাংলা ভার্সনে ৩ হাজার টাকা ও ইংরেজি ভার্সনে আড়াই হাজার টাকা এবং উপজেলা ও মফস্বলে বাংলা ভার্সনে আড়াই হাজার টাকা ও ইংরেজি ভার্সনে ৩ হাজার টাকা।
শিক্ষা বোর্ড শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভর্তির প্রাথমিক নিশ্চায়ন করার সময় রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ ১৪২ টাকা, ক্রীড়া ফি বাবদ ৫০ টাকা, রোভার/রেঞ্জার ফি বাবদ ১৫ টাকা, রেড ক্রিসেন্ট ফি ১৬ টাকা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফি ৭ টাকা, বিএনসিসি ফি ৫ টাকা, শিক্ষক কল্যাণ ফি ও অবসর সুবিধা ভাতা ফি ১০০ টাকাসহ মোট ৩৩৫ টাকা নিতে পারবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘নিয়মে খুব একটা পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। ভর্তি ফি ও অন্যান্য ফিও প্রায় একই রকম থাকবে। এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগেই ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া হতে পারে। অথবা প্রকাশের পরপরই এটা শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে বলেও জানান বোর্ড চেয়ারম্যান।’
ভর্তি ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে, ক্লাস শুরু শিগগির
আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এ ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।
ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, ‘একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ১৫ সেপ্টেম্বর শেষ করা হবে। ভর্তি কার্যক্রম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস শুরু হবে। এখনো ক্লাস শুরুর নোটিশ দেওয়া হয়নি। শিগগির ক্লাস শুরুর নোটিশও আমরা দিয়ে দেবো।’
একনজরে এবারের এসএসসির ফল
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল সকালে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। ১১টি বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। পাস করাদের মধ্যে ছাত্র ৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ জন ও ছাত্রী ৬ লাখ ৭ হাজার ৯৩৯ জন।
ছাত্রীদের গড় পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং ছাত্রদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এবার ফেল করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। ফেল করা শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে খারাপ করেছে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের পরীক্ষার্থীরা প্রতি ১০০ জনে ৫১ জনই এবার ফেল করেছে।
এদিকে, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। তাদের মধ্যে ছাত্রী ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন এবং ছাত্র ৫২ হাজার ৭৮০ জন। পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে এগিয়ে ছাত্রীরা।
১১টি বোর্ডের ফলাফলে সবার ওপরে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং তলানিতে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড। তবে শুধু সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের হিসাব কষলে ফলাফলে সবার নিচে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, রাজশাহীতে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ, কুমিল্লায় ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ, যশোরে ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, বরিশালে ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশ, সিলেটে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, দিনাজপুরে ৫৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
এছাড়া বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আর বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
টিআইএস