রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারকে ঘিরে একের পর এক সহিংসতার অভিযোগ সামনে আসছে। সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনায় নতুন করে বিতর্কে জড়িয়েছেন তিনি। এর আগে উপ-উপাচার্যকে হেনস্তা, প্রশাসন ভবন অবরোধ, শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করা, রেললাইন অবরোধ এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আব্দুল্লাহ আল মাসুদ হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব ঘটনার অনেকগুলোর ভিডিও ফুটেজও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের একাংশের অভিযোগ, ধারাবাহিক এসব ঘটনার পরও আম্মারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। যদিও বিভিন্ন ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
সর্বশেষ গত সোমবার প্রক্টর দপ্তরে এক শিক্ষার্থীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে বৈঠকের পর বিকেলে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে আম্মার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও একজনকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে আবার মারধরের অভিযোগ রয়েছে। পরে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে পোষ্য কোটা ইস্যুতে আন্দোলনের সময় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনের গাড়ি আটকে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ ওঠে। পরে বাসভবনের সামনে ধাক্কাধাক্কির সময় তার গলা চেপে ধরা ও সিঁড়িতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ভিডিওতে উঠে আসে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হলেও তার প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আব্দুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায়ও আম্মারের নাম আলোচনায় আসে। বিভিন্ন ভিডিওতে ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতি দেখা গেলেও তিনি হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, তিনি বরং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন।
আওয়ামীপন্থি হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ডিনের পদত্যাগ দাবিতে প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলনের নেতৃত্বও দেন আম্মার। পরে সংশ্লিষ্ট ডিনরা দায়িত্ব ছাড়েন।
এছাড়া গত জুলাইয়ে এক শিক্ষার্থীকে ট্রেনে মারধরের ঘটনার প্রতিবাদে তার নেতৃত্বে প্রায় আট ঘণ্টা রেললাইন অবরোধ করা হয়। এতে একাধিক ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয় এবং পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব এবং ছাত্রশিবিরের একটি অংশের সমর্থন থাকায় আম্মারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল এ অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, আম্মারের কর্মকাণ্ডের দায় সংগঠনের নয়।
গ্রন্থাগারে মারধরের ঘটনার পর গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলসহ বিভিন্ন সংগঠন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনোভাবেই সহিংসতার জায়গায় পরিণত হতে দেওয়া যায় না।
অভিযোগের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, তার কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, সেটি তিনি জানেন। এমনকি এসব কারণে তার ছাত্রত্বও বাতিল হতে পারে বলেও তিনি অবগত। তবে তার দাবি, ‘আমি নিজের ক্ষতি করে হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করতে চাই। আমার কাজ নিয়ে হাজার সমালোচনা থাকলেও এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব কেউ দেখাতে পারবে না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, ‘আগের ঘটনাগুলোতে তদন্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হলে সর্বোচ্চ শাস্তিও হতে পারত। বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগের তদন্ত কমিটিগুলোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক ঘটনার তদন্তও দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ প্রতিবেদন হাতে পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।