বিশ্বকাপের সময় ইয়ান দিওমান্দের একটি ছবি ভাইরাল হয়েছিল। নিজের হাতে জার্সিতে আঁকা ছিল তার স্বপ্নের মানুষ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিখ্যাত ‘৭’নম্বর। সেই ছোট্ট স্বপ্নবাজ ছেলেটিই এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলেছেন, যেখানে ছিলেন তার সেই আদর্শ রোনালদোও।
হয়তো ভাগ্য সহায় হলে বিশ্বকাপের কোনো এক ম্যাচে দেখা হয়ে যেতে পারত দুজনের। কিন্তু দেখা না হলেও গল্পটা থেমে থাকেনি। কারণ ইয়ানের স্বপ্ন এখন তাকে নিয়ে গেছে রোনালদোর সাবেক ক্লাব, বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল প্রতিষ্ঠান রিয়াল মাদ্রিদে।
কিছু ঘটনা শুধুই কাকতালীয় নয়। বড় অর্জনের পেছনে থাকে বড় কোনো অনুপ্রেরণা। আর ইয়ানের মতো হাজারো তরুণ ফুটবলারের স্বপ্নের পেছনে থাকা মানুষদের একজন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
তবে ইয়ান দিওমান্দের গল্পও কম অনুপ্রেরণার নয়। আইভরিকোস্টের একটি সাধারণ এলাকা থেকে উঠে এসে আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্বের সবচেয়ে অভিজাত ক্লাবগুলোর একটির দরজায়। সত্যিই, মানুষ কখনো কখনো তার স্বপ্নের সমান বড় হয়ে ওঠে।
আইভরিকোস্টের আবিদজানের ইউপোগুন,যে শহরের মাটিতে সংস্কৃতির শেকড়, ফুটবলের উন্মাদনা আর স্বপ্নের গল্প মিশে আছে। যে শহর জন্ম দিয়েছে দিদিয়ের দ্রগবার মতো কিংবদন্তিকে। সেই শহরের প্রতিটি শিশুই একদিন বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কেউ দ্রগবা হতে চায়, কেউ চায় দেশের গর্ব হয়ে উঠতে।
দিওমান্দেও সেই স্বপ্নের পথেই হাঁটছিলেন। ছোটবেলায় মাঠে যখন তিনি বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন, তখন গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে তার বোন রোক্সান বলতেন,
“দেখো, আমার ভাই একদিন বিশ্বসেরা হবে”
রোক্সানের সেই কথায় অনেকেই হাসত, কেউ কেউ তাচ্ছিল্য করত। কিন্তু তিনি নিজের বিশ্বাস থেকে কখনো সরে যাননি। দিওকে সবসময় বলতেন, বিশ্ব তাকে চিনুক বা না চিনুক, একদিন সবাই তাকে চিনবে।
এরপর শুরু হয় কঠিন পথচলা। আইভরিকোস্ট থেকে ফ্লোরিডা, সেখান থেকে স্পেন, অসংখ্য ত্যাগ আর সংগ্রামের পর দিওমান্দে যখন লেগানেসের হয়ে সিনিয়র দলে অভিষেক করেন, তখন যেন তার ভাগ্যের নতুন অধ্যায় লেখা শুরু হয়।
আর সেই অভিষেকের মঞ্চ? ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম পবিত্র মাঠ, সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। প্রতিপক্ষ ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। এর চেয়ে স্বপ্নময় শুরু আর কী হতে পারে! অভিষেক ম্যাচেই নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে জানান দিয়েছিলেন, তিনি এসেছেন বড় মঞ্চের জন্য।
কিন্তু সেই মুহূর্ত দেখার জন্য আজ রোক্সান পাশে নেই। দিওমান্দের বিশ্বসেরা হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়ার আগেই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়ে যান। রেখে যান অসংখ্য স্মৃতি, অসমাপ্ত স্বপ্ন আর এক ভাইয়ের হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা।
দিও আজও রোক্সানকে ভুলে যাননি। প্রতিটি জয়, প্রতিটি গোলের পর আকাশের দিকে তাকিয়ে যেন তাকে খুঁজে নেন। দুই হাত তুলে উৎসর্গ করেন সেই মানুষটিকে, যিনি তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন, যিনি কঠিন সময়ে সাহস জুগিয়েছেন।
আজ সেই দিওমান্দের সামনে খুলে গেছে নতুন এক অধ্যায়। যে বার্নাব্যুতে একদিন তিনি অভিষেক করেছিলেন প্রতিপক্ষ হয়ে, আজ সেই মাঠই তার নিজের। যে সাদা জার্সির দিকে ছোটবেলায় মুগ্ধ চোখে তাকিয়েছিলেন, আজ সেটিই তার গায়ে।
যে ছেলেটি বালিতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি এঁকে তাতে লিখেছিল “রোনালদো ৭”, আজ সে দাঁড়িয়ে আছে সেই কিংবদন্তির পথ অনুসরণ করার সুযোগ নিয়ে। রোনালদো যেমন ওই জার্সিকে অমরত্ব দিয়েছেন, দিওমান্দেও চাইবেন নিজের গল্প দিয়ে নতুন ইতিহাস লিখতে।
দিও, তুমি এগিয়ে যাও। বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখো। কারণ তোমার পেছনে আছে এক বোনের অটুট বিশ্বাস, এক শহরের ভালোবাসা আর কোটি ফুটবলপ্রেমীর আশা।
আর আকাশের ওপারে কোথাও রোক্সান নিশ্চয়ই হাসছেন। কারণ তার ছোট ভাই আজ দাঁড়িয়ে আছে সেরাদের সেরা হওয়ার সিঁড়িতে, সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর আলোয়।