বাংলাদেশে কোনো কোম্পানি প্রতিষ্ঠা বা বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ছাড়া বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না—এমন বিধান রেখে 'ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬'-এর খসড়া প্রকাশ করেছে সরকার। নীতিমালা কার্যকর হলে ফেসবুক, গুগল, ইউটিউবসহ বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন প্রচারের আগে নিবন্ধন নিতে হবে। পাশাপাশি তাদের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ভ্যাট, আয়করসহ অন্যান্য প্রযোজ্য কর পরিশোধ করতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শনিবার (২৬ জুলাই) জনমত গ্রহণের জন্য তাদের ওয়েবসাইটে নীতিমালার খসড়া প্রকাশ করেছে। আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত এ খসড়ার ওপর মতামত গ্রহণ করা হবে। পরে প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন প্রচার বা অনলাইনের মাধ্যমে কোনো পণ্য ও সেবা বিক্রির আগে বিদেশি ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি (ডিবিআইডি) নিবন্ধন নিতে হবে। নিবন্ধনের পর প্রচলিত আইন, কর ও ভ্যাট-সংক্রান্ত বিধান অনুসরণ করেই বিদেশি পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিন ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কেবল বৈধ পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ থাকবে। নকল, নিষিদ্ধ, প্রতারণামূলক বা ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করতে পারে—এমন কোনো পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা যাবে না।
আন্তর্জাতিক ডিজিটাল লেনদেন নিরাপদ করতে নীতিমালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ক্রস-বর্ডার এসক্রো পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে দেশের বিদ্যমান পেমেন্ট অবকাঠামোর সংযোগ স্থাপন, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি আয় দেশে আনা এবং আমদানি ব্যয় পরিশোধ সহজ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আমদানির ক্ষেত্রে বিল অব এন্ট্রি, বিল অব লেডিং বা ইনভয়েসে ক্রেতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা মার্কেটপ্লেসের পরিচয়ও উল্লেখ করতে হবে বলে খসড়ায় বলা হয়েছে।
ডিজিটাল বাণিজ্যের মাধ্যমে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করাও নীতিমালার অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য পার্সেলভিত্তিক রপ্তানিতে বিশেষ নীতিসহায়তা, বীমা সুবিধা, আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধান, ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য ও সেবা সরবরাহে সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমে অর্জিত রপ্তানি আয়কে প্রচলিত রপ্তানির মতো স্বীকৃতি দিয়ে আর্থিক প্রণোদনার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এছাড়া দেশে ও বিদেশে বেসরকারি উদ্যোগে প্রসেসিং সেন্টার, ওয়্যারহাউস ও গুদাম স্থাপন, ড্রপ শিপিং, এন্ট্রেপোর্ট ট্রেড এবং মার্চেন্টিং ট্রেডের ক্ষেত্রেও নীতিগত সহায়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ভোক্তা সুরক্ষায় নীতিমালায় একাধিক বিধান রাখা হয়েছে। নকল, ভেজাল বা প্রতারণামূলক পণ্য বিক্রি, অনলাইন জুয়া, বেটিং, লটারি এবং আমদানি-রপ্তানি নীতিমালায় নিষিদ্ধ পণ্য ও সেবার ডিজিটাল বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ বা চুক্তিবহির্ভূত পণ্য সরবরাহ করা হলে বিক্রেতাকে তা ফেরত নিতে হবে এবং গ্রাহকের অর্থ একই পেমেন্ট মাধ্যমে ফেরত দিতে হবে। বিক্রয়োত্তর সেবা, ওয়ারেন্টি, গ্যারান্টি ও রিফান্ড নীতিও গ্রাহককে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
আন্তর্জাতিক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসা-টু-ব্যবসা (বি-টু-বি), ব্যবসা-টু-ভোক্তা (বি-টু-সি) এবং ব্যবসা-টু-ব্যবসা-টু-ভোক্তা (বি-টু-বি-টু-সি) ভিত্তিক ডিজিটাল আমদানি ও রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডিজিটাল বাণিজ্য ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল বাণিজ্যের জন্য এতদিন সমন্বিত কোনো নীতিমালা ছিল না। নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি, রাজস্ব আদায় এবং ভোক্তা সুরক্ষায় একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি হবে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বিধানগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর।
এসআর