রাজধানী ঢাকায় ৭ থেকে সাড়ে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানলে ভয়াবহ মানবিক ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। ভূতাত্ত্বিক ও প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন একটি ভূমিকম্পে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ ভবন ধসে পড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ফল্ট লাইনে জমে থাকা শক্তি বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে বলে সতর্ক করেছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে পরিকল্পিত প্রস্তুতি, নিরাপদ নির্মাণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। জাপান ও চিলির মতো দেশগুলো প্রকৌশলগত প্রস্তুতির মাধ্যমে বড় ভূমিকম্পের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে।
তিন টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশ
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের একটি। দেশটি মূলত তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট—ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ঢাকার কাছেই রয়েছে মধুপুর ফল্ট এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সিলেটের কাছে রয়েছে ডাউকি ফল্ট সিস্টেম।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব ফল্ট লাইনে দীর্ঘ সময় ধরে বড় ধরনের শক্তি নির্গত না হওয়ায় ভূগর্ভে চাপ জমে থাকতে পারে। সেই চাপ বড় ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।
নরসিংদীর ভূমিকম্পে নতুন করে উদ্বেগ
সম্প্রতি নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শক্তিশালী ওই কম্পনে অনেক ভবন কেঁপে ওঠে এবং কিছু স্থাপনায় ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। এতে সারা দেশে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং বহু মানুষ আহত হন।
এরপরও ছোট মাত্রার কয়েকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। আবহাওয়াবিদ ও ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ছোট ছোট কম্পন অনেক সময় ভূগর্ভে চলমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে এগুলো বড় ভূমিকম্প আসার নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়; বরং ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার কারণ।
ঢাকার লাখো স্থাপনা বড় ঝুঁকিতে
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের রাজউক এলাকায় প্রায় ২১ লাখ স্থাপনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন ঝুঁকি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে দুর্বল কাঠামোর বিপুলসংখ্যক ভবন ধসে পড়তে পারে। এতে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে চার তলার বেশি উচ্চতার ভবনগুলোর বড় একটি অংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকা, সরু গলি এবং অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এলাকাগুলোতে উদ্ধার কার্যক্রম সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দুর্বল মাটি বাড়াচ্ছে বিপদ
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকার অনেক এলাকা জলাশয় ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে। এসব এলাকায় বালু ও নরম পলিমাটির স্তর রয়েছে, যা বড় ভূমিকম্পের সময় শক্তি হারিয়ে তরল পদার্থের মতো আচরণ করতে পারে।
তিনি বলেন, এ ধরনের মাটিতে নির্মিত বহুতল ভবন দেবে যাওয়া, হেলে পড়া বা ধসে পড়ার ঝুঁকি বেশি।
তার মতে, ভূমিকম্প কখন হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তাই ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি, ভবনের নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ঝুঁকির প্রধান কারণগুলো
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি বাড়ানোর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে-
দুর্বল মাটি ও জলাশয় ভরাট: ঢাকার নতুন সম্প্রসারিত এলাকাগুলোর অনেক জায়গায় মাটির ধারণক্ষমতা কম।
বিল্ডিং কোড অমান্য করে নির্মাণ: অনেক ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
সরু রাস্তা ও উদ্ধার জটিলতা: পুরান ঢাকা ও অনেক নতুন এলাকার রাস্তা অত্যন্ত সরু হওয়ায় জরুরি উদ্ধারকাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ: সীমিত জায়গায় বিপুল মানুষের বসবাস ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ভবনের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা না থাকা: অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দীর্ঘদিন নজরদারির বাইরে রয়েছে।
গ্যাসলাইন ও ইউটিলিটি ঝুঁকি: ভূমিকম্পের পর গ্যাস বিস্ফোরণ, আগুন ও পানির লাইন ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
উদ্ধার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: বিপুলসংখ্যক ভবন ধসে পড়লে তা মোকাবিলার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও জনবল এখনো নেই।
করণীয় কী
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি কমাতে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে-
১. নতুন ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) কঠোরভাবে বাস্তবায়ন।
২. নির্মাণের আগে মাটির লিকুইফ্যাকশন পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
৩. ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী করা।
৪. পুরোনো ও দুর্বল ভবন সংস্কার বা প্রয়োজন হলে অপসারণ করা।
৫. কমিউনিটি ভলান্টিয়ার ও উদ্ধারকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো।
৬. ঢাকার জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ ও স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলা।
৭. পুরান ঢাকার সরু রাস্তা প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া।
৮. পর্যাপ্ত খোলা জায়গা ও জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা।
৯. ভূমিকম্প ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
আরএন