ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
চেক ডিজঅনার মামলা: নতুন আইনে গতি এলেও পুরনোয় ভোগান্তি
✎ অবজারভার প্রতিবেদক
⏲ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ১২:১৫ পিএম আপডেট: ১৬.০৭.২০২৬ ১২:২৬ পিএম
প্রতীকী ছবি
X

প্রতীকী ছবি

হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনে (এনআই অ্যাক্ট) সংশোধনের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা মূল্যমানের চেক ডিজঅনার বা প্রত্যাখানের মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়লেও, চলমান পুরনো মামলাগুলো বদলি প্রক্রিয়ার জটিলতায় নতুন ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। ঢাকার আদালতগুলোতে বিপুল সংখ্যক মামলা স্থানান্তরের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি না থাকায় বিচারপ্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে থাকা অনেক মামলা এখন থমকে গেছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের ১৪১(সি) ধারা সংশোধন করে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যা গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাসের মাধ্যমে আইনে পরিণত হয়। নতুন এই বিধান অনুযায়ী, পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত চেক প্রত্যাখানের মামলার বিচারিক এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে। এর বেশি অঙ্কের মামলাগুলো যথারীতি যুগ্ম দায়রা জজ আদালতেই চলমান থাকবে।

আইনজীবীরা নতুন এই আইনি পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ঢাকার যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতগুলোতে চেকের মামলা নিয়ে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনে এটি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন তারা। আগে যেখানে একটি মামলার পরবর্তী তারিখ পড়তে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগত, সেখানে এখন এক বছরের মধ্যে মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে এই নতুন আইনের কারণে বিপাকে পড়েছেন পুরনো মামলার বাদীরা। উত্তরার আলম হোসেন ২০২৪ সালে ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালতে একটি চেক ডিজঅনার মামলা করেন। দুই বছরে মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়ে যাওয়ার পর সেটি ঢাকার সপ্তম যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বদলি হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামলাটিতে সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হলেও গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন অধ্যাদেশের পর মামলাটি সিজেএম আদালতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় এর কার্যক্রম পুরোপুরি থমকে গেছে।

একইভাবে, মহিউদ্দিন  নামে এক ব্যক্তি ২০২২ সালে একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেন। ২০২৩ সালে মামলাটি ঢাকার তৃতীয় যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তরের পর চার্জগঠন করা হয়। কিন্তু নতুন আইনের কারণে প্রায় এক বছর ধরে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। নিয়ম অনুযায়ী মামলাটি সিএমএম আদালতে আসার কথা থাকলেও এখনও তা পৌঁছায়নি।

আইনজীবীদের অভিযোগ, অধ্যাদেশ জারির পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির অভাবে বহু মামলা এখনও বদলি করা সম্ভব হয়নি। বিপুল সংখ্যক মামলার চাপের কারণে আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও হিমশিম খাচ্ছেন। আইনজীবীরা বিভিন্ন আদালত ঘুরেও মামলার সবশেষ তথ্য পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে বাদী বা আসামির অনুপস্থিতিতেই মামলা খারিজ বা রায় হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

আইনজীবীদের মতে, যেসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া বা সাক্ষ্যগ্রহণ যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে শুরু হয়ে গিয়েছিল, সেগুলো সেখানেই শেষ করার বিধান থাকলে এই বিড়ম্বনা এড়ানো যেত।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত মামলা পরিচালনাকারী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সেলিম মিয়া বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। আইন করার আগে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয় না, বরং এক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করা হয়। একসময় এই মামলাগুলো অতিরিক্ত ও যুগ্ম দায়রা আদালত উভয় জায়গাতেই চলত, পরে শুধু যুগ্ম দায়রা আদালতকে ক্ষমতা দেওয়া হয়।’ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে ৫ লাখ টাকার মামলার দায়িত্ব দেওয়াকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বার বার নিয়ম বদলের কারণে নতুন করে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা থাকলে শুরুতেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করা যেত।’

ঢাকার তৃতীয় যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর সুমন ভূ্ঁইয়া মামলার জটের সত্যতা স্বীকার করে জানান, এই আদালতের পাঁচ লাখ টাকার নিচের অনেক মামলা এখনও সিএমএম আদালতে পাঠানো সম্ভব হয়নি। মামলার চাপ অতিরিক্ত হওয়ায় বদলি প্রক্রিয়া কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে, তবে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তবে এই পরিবর্তনকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে একটি নতুন দ্বিমুখী ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের হেড অব লিগ্যাল অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স ব্যারিস্টার মুহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল। তিনি বলেন, ‘আইনটি নিঃসন্দেহে ভালো। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারের এখতিয়ার পাঁচ লাখ টাকা থেকে আরও বাড়ানো উচিত, এতে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।’ শেষ পর্যায়ের মামলার বিলম্বের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীন আদালতগুলোতে মামলার যে জট ছিল, তাতে আগে একটি তারিখ পড়তেই ছয় মাস লাগত। এখন কিছু ক্ষেত্রে সাময়িক অসুবিধা হলেও সামগ্রিকভাবে বেশিরভাগ মামলা ছয় মাসের মধ্যেই নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।’

সার্বিক বিষয়ে ঢাকার মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জানান, ঢাকার মহানগর যুগ্ম দায়রা আদালতগুলোতে প্রায় লাখের কাছাকাছি মামলা বিচারাধীন থাকায় একধরনের ডেডলক বা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। এই বিপুল চাপ আদালতগুলোর পক্ষে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তিনি বলেন, ‘একটা বড় কাজ করতে গেলে সাময়িক কিছু অসুবিধা হয়। একই আইনে তো আর ভিন্ন মামলার জন্য ভিন্নরকম বিধান হতে পারে না। তাই দীর্ঘমেয়াদি ভালো ফলাফলের জন্য সাময়িকভাবে এই অসুবিধাটুকু আমাদের মেনে নিতে হবে।’

আদালত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যেকোনো নতুন আইন বা সংশোধনী বাস্তবায়নের শুরুর দিকে মাঠপর্যায়ে কিছুটা সমন্বয়হীনতা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। তবে মামলার নথি বা ফাইল এক আদালত থেকে অন্য আদালতে স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়াটিকে আরও ডিজিটাল বা সুনির্দিষ্ট করা গেলে বাদীদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে। ঢাকার আদালতগুলোতে চেকের মামলার যে বিপুল জট রয়েছে, তা নিরসনে এই আইনি সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে বিচারপ্রার্থীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে বলেই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

এসএ



Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝