ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
অবৈধ পথে ইউরোপ যাত্রা: মুক্তিপণেও মেলেনি মুক্তি, অপেক্ষায় স্বজনরা
✎ আবুল হাসান সোহেল
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৬:০১ পিএম আপডেট: ১৫.০৭.২০২৬ ৬:৩২ পিএম
অপেক্ষারত স্বজনেরা।
X

অপেক্ষারত স্বজনেরা।

পূর্ব টুবিয়া গ্রামের সরু কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটলে বারবার চোখে পড়ে একই দৃশ্য—উঠানে বসে থাকা বৃদ্ধ মা, দরজার পাশে নির্বাক বোন, আর প্রতিটি মোবাইল ফোনের রিংটোনে চমকে ওঠা স্বজনেরা। কারও অপেক্ষা ছেলের জন্য, কারও ভাইয়ের জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষা দিন পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে প্রায় এক বছর হলেও শেষ হচ্ছে না। একসময় যেসব ঘরে বিদেশযাত্রার স্বপ্ন ছিল, আজ সেখানে শুধুই কান্না, ঋণের বোঝা আর অনিশ্চয়তার অন্ধকার।

অভিযোগ উঠেছে, ইতালিতে বৈধভাবে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদী ইউনিয়নের পূর্ব টুবিয়া গ্রামের বহু যুবককে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এরপর তাদের ওপর চালানো হয়েছে পাশবিক নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে আদায় করা হয়েছে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও অনেকের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।

পরিবারগুলোর অভিযোগ, স্থানীয় কয়েকজন দালালের মাধ্যমে যুবকদের মূল হোতা কুনিয়া ইউনিয়নের আদিত সুমন বেপারীর কাছে পাঠানো হয়। পরে তাদের ইতালির বদলে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে জিম্মি করা হয়।

২২ লাখ টাকায় শুরু, তারপর নির্যাতনের ভিডিও

২০২৫ সালের মার্চে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছাড়েন রাহাত তালুকদার। পরিবারের দাবি, স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ২২ লাখ টাকা দিয়ে তাকে পাঠানো হয়। কয়েকদিন পরই সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

ইতালি নয়, রাহাত তখন লিবিয়ার একটি নির্যাতনকেন্দ্রে। মুখে কাপড় বেঁধে, হাত-পা বেঁধে মারধরের ভিডিও পাঠানো হয় পরিবারের কাছে। বলা হয়, আরও ২৫ লাখ টাকা না দিলে তাকে হত্যা করা হবে।

রাহাতের মা মায়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ভিডিওতে ছেলের চিৎকার শুনে মনে হয়েছে, আমি তখনই মারা গেছি। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য যা ছিল সব বিক্রি করেছি। আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করেছি, মানুষের কাছে হাত পেতেছি। তারপরও আমার ছেলের কোনো খবর পাইনি। সে বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে—এটুকুও জানি না। প্রতিদিন আল্লাহর কাছে শুধু একটি দোয়া করি, একবার আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিন। একজন মায়ের জীবনে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর হতে পারে না। আমি শুধু চাই, আমার সন্তানকে জীবিত ফিরিয়ে আনা হোক এবং যারা এই সর্বনাশ করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।”

রাহাতের দুলাভাই জামাল মাতুব্বর বলেন, “দালালরা প্রথমে স্বপ্ন দেখিয়েছে, পরে সেই স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। টাকা নেওয়ার পর তারা ফোন ধরা বন্ধ করে দেয়। আমরা শুধু চাই, প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক।”

মস্তফার জন্য ৫০ লাখ, তবুও নিখোঁজ

একই গ্রামের মস্তফা হাওলাদারের ঘটনাও একই রকম। ইতালি পাঠানোর আশ্বাসে দেশ ছাড়ার পর পরিবারের কাছে আসে নির্যাতনের ভিডিও। ছেলেকে জীবিত ফেরানোর আশায় একের পর এক টাকা জোগাড় করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয় দালালদের হাতে। কিন্তু তারপরও মস্তফার কোনো সন্ধান মেলেনি।

তার মা বিলকিস আরা বেগম বলেন, “আমরা ভিটেমাটি বিক্রি করেছি, গরু বিক্রি করেছি, মানুষের কাছে হাত পেতেছি। কিন্তু আমার ছেলে আর ফেরেনি। একজন মায়ের জীবনে এর চেয়ে বড় কষ্ট নেই। প্রতিটি রাত আমার কাছে দুঃস্বপ্নের মতো কাটে। আমি শুধু আমার সন্তানকে একবার দেখতে চাই। যারা আমাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে, তাদের কঠোর শাস্তি চাই।”

আরাফাতের জন্য ৫৩ লাখ, তারপর নীরবতা

আরাফাত কাজীকেও একইভাবে ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের।

তার বড় ভাই মাহাবুব কাজী বলেন, “৫৩ লাখ টাকা দেওয়ার পরও ভাইয়ের কোনো খবর পাইনি। প্রতিদিন একটি ফোনকলের অপেক্ষায় থাকি, যদি কোনো সুখবর আসে। কিন্তু সেই অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। আমরা চাই, প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের ভাইসহ অন্যদের উদ্ধার করুক।”

একটি গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবারে একই কান্না

রাহাত, মস্তফা কিংবা আরাফাত—এরা শুধু তিনটি নাম। এলাকাবাসীর দাবি, পূর্ব টুবিয়া গ্রামের অন্তত অর্ধশতাধিক যুবক একই কৌশলে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

অনেক পরিবার মুক্তিপণ দিতে গিয়ে জমি বিক্রি করেছে, গয়না বিক্রি করেছে, ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়েছে। তবুও তাদের সন্তানেরা ফেরেনি।

স্থানীয় জুবায়ের তালুকদার, মহাসিন তালুকদার ও সিয়াম তালুকদার বলেন, “দালালরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলত, কয়েক মাসের মধ্যেই ইতালিতে ভালো চাকরি হবে। সেই কথায় বিশ্বাস করে মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছে। এখন পুরো গ্রামজুড়ে শুধু কান্না।”

স্থানীয় আসাদ ও সুজন বলেন, “এটি শুধু প্রতারণা নয়, এটি একটি সংগঠিত মানবপাচার চক্র। দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।”

প্রশাসনের বক্তব্য

মাদারীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি নিখোঁজদের উদ্ধারের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।”

স্বপ্ন থেকে শোকগাথা

বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলাবে—এই বিশ্বাসে ঘর ছেড়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ পরিণত হয়েছে অসংখ্য পরিবারের অন্তহীন শোকে।

মুক্তিপণ দিতে গিয়ে কেউ হারিয়েছেন জমি, কেউ বসতভিটা, কেউ সারা জীবনের সঞ্চয়। তবুও ফিরে আসেনি প্রিয় মানুষটি।

পূর্ব টুবিয়া গ্রামের প্রতিটি সন্ধ্যা যেন একই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া এই যুবকেরা কি কোনোদিন আবার তাদের মায়ের কোলে ফিরবে? নাকি তাদের গল্পও একদিন হারিয়ে যাবে মানবপাচারের নির্মম ইতিহাসে?

আরএ/আরএন


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝