গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের প্রস্তাব তো আমিই করেছিলাম। সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্যই এটি করা হয়েছিল। ওই সনদ আমরা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে চাই। এ জন্য সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন।’
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার’ শীর্ষক সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুযায়ী জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশটি উত্থাপন করেন রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘জুলাই প্রশ্নে আমরা সবাই এক। আমরা যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে তুলেছিলাম, তা ধরে রাখতে হবে। আমাদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করতে হবে। এ আন্দোলনের কৃতিত্ব যেন কেউ এককভাবে দাবি না করে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী যেন এ আন্দোলনকে বিতর্কিত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’ তিনি সবার আগে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
আওয়ামী লীগের দলগত বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ দাবিতে বিএনপি শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল। পরবর্তীতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে দলগত বিচারের আইনি ভিত্তিও তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় সরকার শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। দেশে ফিরলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা, প্রসিকিউটর, তদন্তকারী কর্মকর্তা ও লজিস্টিক সহায়তা বাড়ানো হবে, যাতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যায়।
তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে সরকার সংবিধান সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য এখনো পাঁচটি আসন খালি রাখা হয়েছে। তিনি বিরোধী দলকে আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানান।
জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের জন্য সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রতিটি শহীদ পরিবারের জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকা, ‘ক’ শ্রেণির আহতদের ৫ লাখ টাকা, ‘খ’ শ্রেণির আহতদের ৩ লাখ টাকা এবং ‘গ’ শ্রেণির আহতদের ১ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য মাসিক ভাতাও চালু করা হয়েছে। গুরুতর আহতদের প্রয়োজনে বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে। জুলাই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম ও সবচেয়ে বড় অর্জন জুলাই ঘোষণাপত্র। সেই ঘোষণাপত্রের ধারাবাহিকতায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছে। কিন্তু সংসদে গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনায় এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের কথা যথাযথভাবে উঠে আসেনি। তিনি বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র ও জাতীয় সনদে শহীদ পরিবার, আহত জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, সরকার তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই ছিল দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত ফলাফল। তাই শুধু জুলাই নয়, সেই দীর্ঘ সময়ের সব শহীদ, আহত, গুম ও নির্যাতিত ব্যক্তিদেরও রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংককের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। অনেককে আগের সরকারের সময় চিকিৎসার জন্য পাঠানো হলেও এখনো বহু আহত ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন মহলে ঘুরছেন। আহত ও পঙ্গু জুলাই যোদ্ধাদের যথাযথ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে হলেও তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জুলাই জাদুঘর দ্রুত জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া উচিত। ভবনের কিছু কাজ বাকি থাকলেও জাদুঘর চালু করা যেতে পারে। জুলাই ফাউন্ডেশনকে কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যদি সত্যিই কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরে বেতন না পেয়ে থাকেন, তবে সরকারকে দ্রুত বিষয়টি সমাধান করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার বিলম্বিত হলে জাতি তা মেনে নেবে না। তবে বিচার অবশ্যই ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে হতে হবে এবং কারও প্রতি অন্যায় করা যাবে না। দীর্ঘ আন্দোলনের সময় বহু মানুষ কারাবন্দি হয়েছেন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগও জাতিকে স্মরণ রাখতে হবে এবং যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে।
সীমান্ত ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সীমান্তে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকার ও বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য প্রয়োজন। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য থাকা জরুরি।
তিনি বলেন, গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। জনগণের ভোটের প্রতিফলন বাস্তবায়িত না হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হবে। জুলাইয়ের স্পর্শকাতর সময়কে সামনে রেখে সব রাজনৈতিক দলকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এখন বাংলাদেশের স্বীকৃত সত্য। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, জুলাই ততদিন জাতীয় চেতনা, অহংকার ও রাজনৈতিক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যে জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বের পরিচয় দিচ্ছেন, সেটিই জুলাই চেতনার বাস্তব প্রতিফলন।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৬টি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে ১২টির তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে এবং চারটি মামলায় অভিযোগ গঠন হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি মামলার রায়ও হয়েছে, যার মধ্যে আবু সাঈদ হত্যা মামলাও রয়েছে।
আইনমন্ত্রী জানান, জুলাই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালে ৫৯০টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই শেষে ১০৯টি মামলা গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ৪৩টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়েছে, ছয়টি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং চারটি মামলার রায় অপেক্ষমাণ রয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৩৫ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। একজন রাজসাক্ষী খালাস পেয়েছেন এবং আরও ২৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সংগঠন হিসেবে তদন্ত এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত ঘটনাগুলোর তদন্তও শুরু হয়েছে বা পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, যারা বিদেশে বসে আত্মসমর্পণের হুমকি দিচ্ছেন, বাংলাদেশের আইনে তাদের আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই। তারা দেশের সীমানায় প্রবেশ করলেই গ্রেপ্তার হবেন। জুলাই চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ কখনোই ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন হতে দেবে না। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনা উত্থাপন করে আখতার হোসেন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করার নানা চেষ্টা থাকলেও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আওয়ামী লীগ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। ফলে অপপ্রচার চালিয়ে সেই সত্য আড়াল করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যাপক জনসম্পৃক্ত আন্দোলন ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থান। দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, এমনকি প্রবাসীরাও এতে অংশ নিয়েছিলেন। এত বড় আত্মত্যাগের পরও বিচারকাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, শেখ হাসিনাসহ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তরা এখনো বিচারের বাইরে রয়েছেন। তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হবে।
এ আলোচনায় আরও অংশ নেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমান এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও জুলাই শহীদ জাবিরের মা রোকেয়া বেগম।