রাজধানীর ধানমন্ডিতে চিকিৎসক ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাঁর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান গত মঙ্গলবার এ আদেশ দেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আদালতে এ বিষয়ে আবেদন করলে তা মঞ্জুর করেন আদালত।
আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, মামলার অভিযোগ অনুযায়ী চিকিৎসক নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রাকে পরিকল্পিতভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁর চিকিৎসায় অবহেলা করা হয়েছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়, ধীপ্রার মৃত্যুর পর ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে আসামিরা ময়নাতদন্ত ছাড়াই গত ৫ জুন তড়িঘড়ি করে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান আদালতের কাছে মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত, ময়নাতদন্ত এবং পরে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী পুনরায় দাফনের অনুমতি চান।
আদালত আবেদনের সঙ্গে দাখিল করা নথিপত্র পর্যালোচনা করে বলেন, মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার ময়নাতদন্ত প্রয়োজন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এ কারণে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৭৬(২) ধারার বিধান অনুযায়ী ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আদালতের আদেশের অনুলিপি ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা সিভিল সার্জন, তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৪ জুন ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর স্বজন, বন্ধু ও সহপাঠীরা-যাদের অনেকেই চিকিৎসক-দাবি করেন, মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রচারিত ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’-এর ব্যাখ্যায় গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার ছিলেন ধীপ্রা। মৃত্যুর আগে তাঁকে টানা তিন দিন একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল এবং পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা। মৃত্যুর দুই দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে নির্যাতনের নানা ঘটনার কথাও তুলে ধরেছিলেন তিনি।
এ ঘটনায় গত ১৬ জুন দণ্ডবিধির ৩০৪(ক), ১৯৩, ১৯৭, ২০১, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় অবহেলাজনিত মৃত্যু, নির্যাতন এবং ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের মাধ্যমে আলামত গোপনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন নিহত চিকিৎসকের স্বজন মো. মশিউর রহমান শাহ।
মামলায় আসামি করা হয়েছে ধীপ্রার স্বামী ডা. রহমত রশিদ সিয়াম, শ্বশুর বারডেম হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ, শাশুড়ি সিদ্দিকা সুলতানা, শ্বশুরের জামাতা ও ব্যঙ্গাত্মক ওয়েবসাইট ‘ইয়ার্কি’র সম্পাদক সিমু নাসেরসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কবর থেকে মরদেহ উত্তোলনের পর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ধীপ্রার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং মামলার তদন্তে নতুন দিক উন্মোচিত হতে পারে।
-টিএস