নৌকায় চড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাত্রা, হাঁটুপানি পেরিয়ে হলে প্রবেশ, কোথাও আবার পানির মধ্যেই তিন ঘণ্টার পরীক্ষা—ভরা বর্ষায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের এমন দুর্ভোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে: কেন বর্ষাকালেই নেওয়া হলো দেশের অন্যতম বড় পাবলিক পরীক্ষা?
দেশজুড়ে টানা বৃষ্টিতে যখন নদী-খাল উপচে পড়ছে, শহরের সড়কগুলো পরিণত হয়েছে জলাশয়ে, আর গ্রামাঞ্চলে দেখা দিয়েছে বন্যার পরিস্থিতি—ঠিক তখনই চলছে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা। প্রায় ১৩ লাখ পরীক্ষার্থীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
কেউ নৌকায় করে পৌঁছেছেন পরীক্ষাকেন্দ্রে, কেউ কোমরসমান পানি পেরিয়ে, আবার কেউ সাঁতরে পৌঁছেছেন স্কুলের বারান্দায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের অসহায় পরিস্থিতি। এসব দৃশ্য দেখে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে।
পরীক্ষার হলে যাওয়ার পথেই পরীক্ষা
এইচএসসি পরীক্ষার শুরুটা স্বাভাবিক থাকলেও কয়েক দিনের মধ্যেই আবহাওয়া পরিস্থিতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ২ জুলাই পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ের কয়েকটি পরীক্ষা স্বাভাবিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়। তবে ৮ জুলাই থেকে শুরু হয় সংকট।
বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন কয়েকটি জেলায় পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েক দফায় দুর্যোগপূর্ণ এলাকার পরীক্ষা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
এদিকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। কোথাও কোথাও পরীক্ষার কক্ষেও পানি ঢুকে পড়ে।
কেন বর্ষাকালে এইচএসসি?
এই প্রশ্ন এখন ঘুরছে সর্বত্র। কারণ দীর্ঘদিন ধরে দেশের পাবলিক পরীক্ষার প্রচলিত সময় ছিল তুলনামূলকভাবে শুষ্ক মৌসুম।
শিক্ষা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সাধারণত ফেব্রুয়ারি-মার্চে এসএসসি এবং এপ্রিল-মে মাসে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হতো। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ২০২০ সাল থেকে পরীক্ষার সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এক বছর এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি, দেওয়া হয় অটোপাস।
পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা ধীরে ধীরে আগের সময়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলেও নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতাও শিক্ষা ক্যালেন্ডারে প্রভাব ফেলে।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা ৭ জুন শুরু করার পরিকল্পনা থাকলেও শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তা এক মাস পিছিয়ে ২ জুলাই করা হয়। আর এই পরিবর্তনের ফলেই পরীক্ষা চলে আসে বর্ষার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে।
দায় কার?
পরীক্ষা পেছানোর সিদ্ধান্তের দায় নিচ্ছে না শিক্ষা প্রশাসন। তাদের দাবি, শিক্ষার্থীদের সিলেবাস শেষ করার সময়ের কথা বিবেচনা করেই পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় ১৩ লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা একদিন পিছিয়ে দেওয়া হলেও এর সঙ্গে যুক্ত হয় নানা প্রশাসনিক জটিলতা। একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার কারণে একটি অঞ্চলের পরীক্ষা স্থগিত হলে পরবর্তীতে আলাদা ব্যবস্থাপনা করতে হয়।
তবে শিক্ষাবিদদের মতে, এত বড় একটি জাতীয় পরীক্ষা আয়োজনের ক্ষেত্রে শুধু একাডেমিক প্রস্তুতি নয়, আবহাওয়া ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের পানি পেরিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে বাধ্য করা ন্যায়সংগত নয়। এতে সব পরীক্ষার্থীর জন্য সমান পরিবেশও নিশ্চিত করা যায় না।
শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপও বাড়ছে
পরীক্ষার্থীদের জন্য শুধু যাতায়াতের সমস্যাই নয়, তৈরি হয়েছে মানসিক চাপও।
এক পরীক্ষার্থী জানান, টানা বৃষ্টি, বিদ্যুৎ সমস্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটেছে। তারপরও বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেই পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে।
অনেক অভিভাবকের অভিযোগ, পরীক্ষার সময় নির্ধারণের আগে আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা উচিত ছিল।
ভবিষ্যতে পরিবর্তনের আশ্বাস
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক জানিয়েছেন, আগামী বছর থেকে বর্ষাকালে কোনো পাবলিক পরীক্ষা রাখা হবে না।
তিনি বলেন, এসএসসি পরীক্ষা ধীরে ধীরে জানুয়ারি এবং এইচএসসি পরীক্ষা মার্চ-এপ্রিলের স্বাভাবিক সময়ে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর বর্ষা, বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে সংকট তৈরি হয়। তাই শুধু পরীক্ষার সময় পরিবর্তন নয়, দুর্যোগের সময় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
কারণ একটি পাবলিক পরীক্ষা শুধু একটি রুটিন নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ যেন আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার কাছে আটকে না যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।