প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ডিএমসি) শুধু একটি চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান—দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে।
শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ মিলন চত্বরে শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরআগে তিনি কলেজ অডিটোরিয়াম চত্বরে একটি বৃক্ষও রোপণ করেন। এ সময় তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ শুধু দক্ষ চিকিৎসকই নয়, দেশপ্রেমিক শিক্ষক, গবেষক, সমাজনেতা ও মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করেছে। এ প্রতিষ্ঠানের বহু মানুষ অন্যের জীবন রক্ষায় নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করতেও দ্বিধা করেননি।
তিনি প্রতিষ্ঠানের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে যারা আজ আর বেঁচে নেই, কিন্তু যাঁদের অবদানে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের সেবায় অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে, তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রাজধানীসহ দেশের মানুষের আস্থার অন্যতম কেন্দ্র। প্রতিদিন এই হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ড ও করিডোরে অসংখ্য মানুষের জীবনসংগ্রাম, আনন্দ ও বেদনার গল্প রচিত হয়। একজন চিকিৎসকের স্টেথোস্কোপের এক প্রান্তে যেমন তার কান থাকে, অন্য প্রান্তে স্পন্দিত হয় একটি মানুষের জীবন এবং একটি পরিবারের অগাধ বিশ্বাস।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক গুণাবলিও একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় শক্তি। আন্তরিক আচরণ ও সঠিক পরামর্শ অনেক সময় রোগীর কাছে ওষুধের মতোই কার্যকর হয়ে ওঠে। তিনি চিকিৎসকদের মানুষের প্রকৃত বিপদের বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেন।
হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদারে সরকার প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর শূন্যপদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতিকে সামনে রেখে সরকার প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর বিকাশ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও হৃদরোগ এবং ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ সম্পর্কে আগাম পরামর্শ ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে অনেক রোগ প্রাথমিক পর্যায়েই নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় সম্ভব।
তিনি জানান, জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারাদেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এদের ৮০ শতাংশ হবেন নারী, যারা পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবেন।
স্বাস্থ্যখাতে এবারের জাতীয় বাজেটে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে এই বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ এবং আগামী পাঁচ বছরে তা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকার ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, পেরিফেরাল ভাসকুলার স্টেন্ট, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন ফাইবার, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও কর কমিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বর্তমানে ৩১ থেকে ৫১ শয্যার প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিশুস্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিশেষায়িত শিশুচিকিৎসা রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলেও সহজলভ্য হবে।
মেডিক্যাল শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও বৈজ্ঞানিক মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের সঙ্গে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই হাসপাতালগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, আজকের মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ও ইন্টার্নদের হাত ধরেই চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা বন্ধ হবে এবং দেশের মানুষ নিজ দেশেই বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা পাবে।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে পাশে বসিয়ে গুলশানের বাসভবন থেকে নিজেই গাড়ি চালিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে উপস্থিত হন।
জেবি/এসএ