দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সচল রাখতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য সাত দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বন্যাকবলিত এলাকায় চিকিৎসাসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে প্রয়োজন হলে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিলসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসানের সই করা এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
‘সভার কার্যবিবরণী’ শিরোনামের ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে গত ১০ জুলাই সন্ধ্যায় দেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে এক জরুরি ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবসহ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভাগীয় পরিচালক এবং দেশের সব সিভিল সার্জন অংশ নেন। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য মাঠপর্যায়ে সাত দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, বন্যাকবলিত প্রতিটি উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে একজন করে ফোকাল পারসন নিয়োগ দিতে হবে। তাঁরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয় করবেন। একই সঙ্গে বন্যাদুর্গত মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মোবাইল মেডিকেল টিম গঠন করতে হবে।
এ ছাড়া বন্যা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত গণমাধ্যমকে অবহিত করার পাশাপাশি আগামী ১২ জুলাই জরুরি প্রেস ব্রিফিং আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরি ওষুধ, ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস), স্যালাইন এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত অ্যান্টি-স্নেক ভেনম সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে পার্শ্ববর্তী স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান থেকে সমন্বয়ের মাধ্যমে তা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজন হলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রসূতিদের হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, বন্যাকবলিত এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সব স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ ও অন্যান্য কর্মচারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন হলে ছুটি বাতিলসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এর আগে ২০২২ সালে সিলেট ও সুনামগঞ্জে কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ বন্যায় লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন এবং অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যত অচল হয়ে যায়। বন্যার সময় ও পরে ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ এবং সাপের কামড়ের ঘটনা বেড়ে যায়। পরে ২০২৪ সালের আগস্টে ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ১১টি জেলার প্রায় ৫৭ লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ডায়রিয়া, ত্বকের সংক্রমণ ও সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এবারও আগাম প্রস্তুতি হিসেবে মাঠপর্যায়ে মেডিকেল টিম, জরুরি ওষুধ, অ্যান্টি-স্নেক ভেনম এবং নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বন্যার সময় সাধারণত বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ে, সাপের কামড়ের ঘটনাও বৃদ্ধি পায়। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে আমরা সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তুত রাখছি। প্রয়োজন অনুযায়ী মোবাইল মেডিকেল টিম গঠন করা হবে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রস্তুত রয়েছে।’
এসআর