রাজশাহী মেডিকেলে কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা রোগ নির্ণয়ের রিপোর্ট পেতে জটিলতা, দীর্ঘ অপেক্ষার সারি এবং চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির কারণে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। রোগী ভর্তির চার দিন পরও মূল চিকিৎসা শুরু না হওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে ইনডোর—সবখানেই পোহাতে হচ্ছে নানা ধরনের হয়রানি।
রিপোর্টের অপেক্ষায় কাটছে চার দিন
হাসপাতালের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আনোয়ারার স্বামী সইবুর রহমান সাবু জানান, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি তাঁর স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। শুক্র ও শনিবার অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা রাউন্ডে না থাকায় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট পেতে রবিবার দুপুর গড়িয়ে যাওয়ায়, চিকিৎসকেরা রোগী দেখার আগেই রাউন্ড শেষ করে চলে যান। ফলে রোগ নির্ণয়ের ভিত্তিতে মূল চিকিৎসাপত্র পেতে রোগীকে সোমবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
একইভাবে বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার ভর্তি হওয়া অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই রিপোর্ট হাতে পেতে চার দিন পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে অন্তর্বর্তী সময়ে চিকিৎসকেরা অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে ওষুধ দিচ্ছেন।
পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সিরিয়াল ও দালাল চক্রের ভোগান্তি
১৭ নম্বর ওয়ার্ডে স্ট্রোকের রোগী রইচ উদ্দিনের (৫৫) মেয়ে ফাতেমা জানান, তাঁর বাবাকে শনিবার এমআরআই করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে রেডিওলজি বিভাগে প্রতিদিন ২০ জনের বেশি রোগীর এমআরআই করা হয় না। ফলে সিরিয়াল না পেয়ে বাবাকে ট্রলিতে করে আবার ওয়ার্ডে ফিরিয়ে নিতে হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রেডিওলজি বিভাগে রোগী আনা-নেওয়ার জন্য হাসপাতালের ট্রলিম্যানকে বাধ্য হয়ে ২০০ টাকা দিতে হয়েছে। সোমবার ভোর ৬টায় লাইনে দাঁড়িয়েও সিরিয়াল পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে তাঁরা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
বহির্বিভাগেও চরম অব্যবস্থাপনা
রিপোর্ট দেখাতে গিয়ে চিকিৎসকের দেখা মেলেনি
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুল কাদের গত শনিবার বহির্বিভাগে আল্ট্রাসনোগ্রাম করান। রবিবার দুপুর ১টার দিকে রিপোর্ট নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে দেখেন, প্রায় দেড় শতাধিক রোগী অপেক্ষমাণ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দুপুর ২টার দিকে চিকিৎসক সাইদ সাতিল মুজতাহিদ কক্ষ ত্যাগ করেন। ফলে আব্দুল কাদেরসহ অন্তত ৫০ জন রোগী চিকিৎসা না পেয়েই ফিরে যান।
ডাক্তার আছেন, কিন্তু রিপোর্ট নেই; রিপোর্ট আছে, কিন্তু ডাক্তার নেই
পবা উপজেলার আব্দুল মজিদ ও ইসমাইল হোসেন শনিবার রক্ত পরীক্ষা করান এবং রবিবার দুপুরে রিপোর্ট হাতে পান। কিন্তু চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে জানতে পারেন, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক মোক্তার আলী বুধবার বসবেন। অন্য চিকিৎসকের কাছে গেলে তাঁদের নতুন টিকিট কেটে আবার লাইনে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
রাজশাহী মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র চিকিৎসক শঙ্কর কে বিশ্বাস হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন,
“রিপোর্ট পেতে রোগীদের কিছুটা সময় লাগছে, কারণ রোগীর চাপ অত্যন্ত বেশি। সেই তুলনায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিমাণও অনেক। আমরা সুশৃঙ্খলভাবে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য কাউন্টার বাড়িয়েছি। তবে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও চিকিৎসকদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই।”
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, তীব্র শয্যা ও জনবল সংকটের মধ্যে চিকিৎসার জন্য এসে পদে পদে এমন হয়রানি থেকে সাধারণ মানুষ কবে মুক্তি পাবে?
আরএইচ/আরএন