হামের জ্বর, র্যাশ ও অন্যান্য উপসর্গ কমে যাওয়ার পরও অনেক রোগীর জন্য শেষ হচ্ছে না ভোগান্তি। বরং নতুন করে দেখা দিচ্ছে চোখের গুরুতর জটিলতা। চিকিৎসকদের ভাষ্য, হামের পর কনজাংটিভাইটিস, কর্নিয়ার প্রদাহ থেকে শুরু করে কর্নিয়ায় আলসার পর্যন্ত হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হয়।
চক্ষু বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক মাসে হাম-পরবর্তী চোখের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু গত সাড়ে তিন মাসেই প্রায় ৩৫০ জন রোগী এ ধরনের জটিলতায় চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দুই শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ৫০টির বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। অন্যদিকে কর্নিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মাসুদুল হাসান তাঁর ব্যক্তিগত চেম্বারে প্রায় ১০০ জন রোগী দেখেছেন।
শরীর ভালো, কিন্তু চোখে শুরু নতুন সমস্যা
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী চিকিৎসক তৃপ্তি বিশ্বাস (ছদ্মনাম) গত মাসে হামে আক্রান্ত হন। কয়েক দিনের জ্বর, শরীরে র্যাশ ও দুর্বলতার পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু এরপরই চোখ লাল হয়ে যায়, দৃষ্টি ঝাপসা হতে শুরু করে। চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে, আলো সহ্য করতে পারছিলেন না।
তিনি বলেন, চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানতে পারি, হামের কারণেই চোখে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে।
কর্নিয়ায় ক্ষত তৈরি হলে বাড়ে অন্ধত্বের ঝুঁকি
কর্নিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মাসুদুল হাসান বলেন, অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে হামের প্রধান উপসর্গ কমে যাওয়ার পরই চোখের সমস্যা শুরু হয়। শুরুতে চোখ লাল হওয়া বা কনজাংটিভাইটিস দেখা দিলেও পরে কর্নিয়া আক্রান্ত হয়। তখন রোগীরা ঝাপসা দেখতে শুরু করেন, চোখ দিয়ে পানি পড়ে, আলোর দিকে তাকাতে কষ্ট হয় এবং অনেকের ফটোফোবিয়া দেখা দেয়।
তিনি বলেন, অপুষ্টি বা ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এ অবস্থায় কর্নিয়ায় আলসার তৈরি হতে পারে। চিকিৎসায় দেরি হলে সেই ক্ষত থেকে কর্নিয়ায় ছিদ্র পর্যন্ত হতে পারে, যা স্থায়ী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার কারণ হতে পারে।
তাঁর পরামর্শ, হামের পর চোখে লালভাব, ব্যথা, ঝাপসা দেখা বা আলো সহ্য করতে না পারার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। রোগী আইসোলেশনে থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শিশুদের ঝুঁকি বেশি
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. বজলুল বারী ভূঁইয়া বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে কনজাংটিভাইটিস ও কর্নিয়ার জটিলতা নিয়ে অনেক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। তবে যেসব শিশুর পুষ্টি ভালো, তাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সংক্রমণ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। বিপরীতে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিই বড় ঝুঁকি
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, হামে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে চোখ শুকিয়ে যাওয়া, কর্নিয়ার ক্ষতি এবং দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তিনিও ব্যক্তিগত চেম্বারে হাম-পরবর্তী চোখের সমস্যায় আক্রান্ত একাধিক রোগী পেয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, অপুষ্ট শিশু হাসপাতালে এলেই তাকে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাকেও ভিটামিন ‘এ’ দিলে বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুও উপকার পায়। দরিদ্র পরিবারের অপুষ্ট শিশুদের জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করারও তাগিদ দেন তিনি।
ডব্লিউএইচওর সুপারিশ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, হাম শুধু চোখ নয়, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এতে নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট, কানের সংক্রমণ, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং এনসেফালাইটিসের মতো প্রাণঘাতী জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সংস্থাটির সুপারিশ অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত প্রতিটি শিশুকে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভিটামিন ‘এ’-এর দুটি ডোজ দেওয়া উচিত। এতে চোখের ক্ষতি, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
বাড়ছে হামের সংক্রমণ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৯৯২ জন শিশু হাম বা হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় ১৭৩ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে এবং ৮১৯ জন উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। নতুন করে মারা যাওয়া শিশুটি ঢাকার বাসিন্দা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা এবং বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, হামের জ্বর সেরে গেলেও চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেকের জীবনকে স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে।