দূর থেকে দেখলে মনে হবে সবুজ পাহাড়। কিন্তু কাছে গেলেই ভুল ভাঙবে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে খোলা আকাশের নিচে জমতে জমতে তৈরি হয়েছে বর্জ্যের এই বিশাল স্তূপ। লতাপাতায় ঢেকে যাওয়া এই আবর্জনার পাহাড়ের পাশেই সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জৈব সার কারখানাটি বছরের পর বছর ধরে অচল পড়ে আছে। রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) প্রতিষ্ঠার ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও একটি কার্যকর ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে না ওঠার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে নগরীর নাচনিয়া এলাকার এই ভাগাড়ে।
পরিবেশবান্ধব উপায়ে বর্জ্য শোধন ও জৈব সার উৎপাদনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে তা এখন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ। ফলে রংপুর মহানগরীর ১০ লাখ মানুষ এখন তীব্র দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
তিন দফা উদ্যোগেও কাটেনি অচলাবস্থা রংপুর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের অর্থায়নে নাচনিয়া এলাকায় প্রায় এক একর জমির ওপর সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে এই জৈব সার উৎপাদন প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল নগরীর পচনশীল বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে সার উৎপাদন করা। কিন্তু কারখানাটি চালু করতে এ পর্যন্ত তিনবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। প্রথমে একটি বেসরকারি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তারা কার্যক্রম চালাতে পারেনি। এরপর ২০২১ সালের শেষ দিকে ছিন্নমূল মহিলা সমিতি নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে চুক্তি করা হয়, যা প্রয়োজনীয় পচনশীল বর্জ্যের অভাবে ভেস্তে যায়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে রি-গ্রিন নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান মৌখিক অনুমতি নিয়ে চেষ্টা করলেও সেটিও আর আলোর মুখ দেখেনি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্ল্যান্টের ২১টি প্রকোষ্ঠই এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতিটি প্রকোষ্ঠে ১৫ টন বর্জ্য ধারণের সক্ষমতা এবং প্রতি ১০ কেজি বর্জ্য থেকে ৩ থেকে ৪ কেজি সার উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও, কারখানাটিতে এখন সুনসান নীরবতা। বর্তমানে শুধু মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কিছু কাজ এখানে সীমিত আকারে চালানো হচ্ছে।
নাচনিয়ার কারখানা বন্ধ থাকায় সিটি করপোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের বর্জ্য এখন ফেলা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী কলাবাড়ি-রথবাড়ি এলাকার নতুন ডাম্পিং স্টেশনে। ২০১৯ সালে এটি নির্মিত হলেও সেখানে কোনো আধুনিক বা পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। সীমানা প্রাচীর না থাকায় প্রতিদিন ট্রাকের পর ট্রাক বর্জ্য এনে খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে। ফলে নাচনিয়া, কলাবাড়ি ও রথবাড়ি এলাকার বাতাস দিন দিন ভারী হয়ে উঠছে। রোদ-বৃষ্টিতে বর্জ্য পচে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং বিষাক্ত তরল বর্জ্য চারপাশের মাটি, খাল ও জলাশয়ে মিশে পরিবেশের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।
রথবাড়ি এলাকার বাসিন্দা রাশেদ ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগে যেখানে খেলার মাঠ, ফসলি জমি ও পুকুর ছিল, সেখানে এখন ডাম্পিং স্টেশন করা হয়েছে। দুর্গন্ধের কারণে এখন এই এলাকায় হাঁটাচলাই দায় হয়ে পড়েছে। একই এলাকার বাসিন্দা মিন্টু জানান, খোলা জায়গায় ময়লা ফেলার কারণে বৃষ্টি হলে বিষাক্ত পানি ফসলি জমিতে গিয়ে পড়ে, যা মাছ চাষ ও কৃষির ক্ষতি করছে। অনেক সময় কুকুর-শেয়াল বর্জ্যের স্তূপ থেকে হাড়গোড় ছড়াচ্ছে। অন্তত চারপাশটা সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘিরে পাশের খালটি সংস্কার করা হলে স্থানীয়রা কিছুটা উপকার পেত।
রসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানায়, রংপুর নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার মধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ৬০ থেকে ৬৫ টন বর্জ্য সংগ্রহ করেন। এই বর্জ্য অপসারণে ৮৬০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। সার কারখানার জন্য প্রতিদিন ২০ টন পচনশীল বর্জ্য প্রয়োজন হলেও বাস্তবে পাওয়া যায় মাত্র ২ থেকে ৩ টন। এর মূল কারণ হলো, বাসাবাড়ি থেকে সংগৃহীত বর্জ্যগুলো আলাদা না করে মিশ্র বর্জ্য হিসেবে সরাসরি ডাম্পিং স্টেশনে ফেলা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বর্জ্য পৃথকীকরণ না করায় সার উৎপাদনের জন্য শুধু পচনশীল বর্জ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পরিবেশ সুরক্ষা ফোরাম রংপুরের আহ্বায়ক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, রংপুর নগরীর ভেতরের বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম মোটামুটি সন্তোষজনক হলেও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা এখনও গড়ে ওঠেনি। দ্রুত টেকসই ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে না তুললে এই নগরীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য চরম হুমকির মুখে পড়বে।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রাকিব হাসান জানান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। তিনি বলেন, জৈব সার উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে সরকারের দুটি কনসালটেশন ফার্মের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, যা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া কলাবাড়ি ডাম্পিং স্টেশন নিয়েও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।
এসএ