ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
৮ মাস ‘মৌজ-মাস্তি’
১১ লাখ টাকা বকেয়া রেখে হোটেল থেকে এনসিপি নেতারা চম্পট!
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫৮ পিএম আপডেট: ০১.০৭.২০২৬ ৬:৫৯ পিএম
X Advertisement

ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ কার্যালয় সংস্কারের নামে রাজধানীর একটি আবাসিক হোটেলে জাঁকজমকপূর্ণ ‘নতুন বন্দোবস্ত’ কায়েম করেছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একঝাঁক শীর্ষ নেতা। প্রায় আট মাস ধরে হোটেলের দুটি কক্ষ দখল করে রাতভর আড্ডা, ‘মৌজ-মাস্তি’ এবং নারীদের নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর প্রায় ১২ লাখ টাকা ভাড়া বকেয়া রেখেই চম্পট দিয়েছেন তারা। শুধু তাই নয়, পাওনা টাকা চাওয়ায় হোটেল কর্তৃপক্ষকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়ারও অভিযোগ উঠেছে দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকার আবাসিক হোটেল ‘ইয়ামেনী ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ কর্তৃপক্ষের এমন একটি লিখিত অভিযোগ এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এই অনৈতিক কাণ্ড ও অর্থ আত্মসাতের বিচার চেয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন হোটেলের মহাব্যবস্থাপক খন্দকার রুহুল আমিন।

হোটেল কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তীর এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কমিটির পাঁচ নেতার দিকে। তারা হলেন: ইঞ্জিনিয়ার এস এম শাহরিয়ার (সদস্য সচিব, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপি); সাদেক মির্জা (সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ); মিরাসাত হোসেন হিমেল (যাত্রাবাড়ী থানার প্রধান সমন্বয়কারী) শাখাওয়াত হোসেন এবং তাওসীপ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রের মূল হোতা ইঞ্জিনিয়ার এস এম শাহরিয়ারের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় অত্যন্ত চমকপ্রদ। গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত তিনি ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় কর্মী এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ এমপির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। তার বাবা ছিলেন পতিত সরকারের ঢাকা-৫ আসনের সাবেক এমপি কাজী মনিরুল ইসলাম মনুর বিশেষ সহকারী (পিএস)। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দ্রুত ভোল পাল্টে তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যুক্ত হন এবং রাতারাতি বাগিয়ে নেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপির সদস্য সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ।

এ বিষয়ে গণঅধিকার পরিষদের সাবেক নেতা রাশেদ খান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত শাহরিয়ার ছিল মনু এমপির পিও, আর তার বাবা ছিলেন পিএস! গণঅভ্যুত্থানের পরে সে হয়ে গেছে এনসিপির শীর্ষ নেতা। শুনলাম, আওয়ামী লীগের সম্পদ কোথায় আছে, কীভাবে সেগুলো আহরণ করা যায়, সেজন্য তাকে ‘সোর্স’ হিসেবে দলে বড় জায়গা করে দিয়েছে শীর্ষ নেতারা!

রাশেদ খানের দাবি, শাহরিয়ার গত কোরবানির ঈদে গোলাপবাগ গরুর হাট থেকে এনসিপির নেতাকর্মীদের চাঁদা তোলা প্রায় দেড় কোটি টাকাও একাই ‘মেরে দিয়েছেন’।

হোটেল কর্তৃপক্ষের দায়ের করা লিখিত অভিযোগ এবং হিসাব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ কার্যালয় সংস্কারের কাজের অজুহাত দেখিয়ে এনসিপির এই পাঁচ নেতার নেতৃত্বে কয়েক ডজন নেতাকর্মী ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় আট মাস হোটেলের ৭২৫ ও ৭২৭ নম্বর কক্ষ দুটি ব্যবহার করেন।

হোটেলের প্রতিটি কক্ষের দৈনিক ভাড়া ছিল ৩ হাজার টাকা। সেই হিসাবে দুই কক্ষের মোট বকেয়া ভাড়া দাঁড়ায় ১১ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ টাকা। বুকিংয়ের সময় তারা মাত্র ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দিলেও পরবর্তীতে আর একটি টাকাও পরিশোধ করেননি।

হোটেল ইয়ামেনী ইন্টারন্যাশনালের হিসাব বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ কাজল ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, হোটেলে যারা থাকত তাদের কেউ কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আবার কারও বাসা শনিরআখড়া ও জুরাইনে। তারা রাতভর এখানে আড্ডা দিত এবং প্রায়ই বহিরাগত নারীদের নিয়ে আসত। আমরা যখন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করে বলেছি যে ‘নারী নট অ্যালাউড’, তারা তখন আমাদের হুমকি দিয়ে বলত ‘আপনাদের কাজ আপনারা করেন, আমাদের কাজ আমাদের করতে দেন’।

মোহাম্মদ কাজল আরও জানান, ভাড়ার জন্য বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও নেতারা শুধু ‘দিচ্ছি-দেব’ বলে ঘোরাতেন। অবশেষে জাতীয় নির্বাচনের পরদিন সকালে দেখা যায় তারা সবাই রুমের চাবি না দিয়েই চম্পট দিয়েছেন। বাধ্য হয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকে এবং রুম পরিষ্কার করে নতুন তালা লাগায়। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজও হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান অভিযুক্ত ইঞ্জিনিয়ার এস এম শাহরিয়ার সব অস্বীকার করে বলেন, হোটেলের রুম ভাড়ার বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। নারী নিয়ে হোটেলে অবস্থানের প্রশ্নই আসে না। ওই ব্যক্তিটি আমি নই। ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত থাকার ভিডিওর বিষয়ে তিনি দাবি করেন, সেটি ২০২৩ সালের পুরোনো ভিডিও।

অন্যদিকে অপরাধের আংশিক স্বীকারোক্তি দিয়ে এনসিপি নেতা শাখাওয়াত হোসেন বলেন, রুমটি আমার নামে বুকিং হয়নি, তবে আমি তাদের সাথে ওখানে গিয়েছিলাম এটা সত্যি। দুই রুমে কখনো পাঁচজন, সাতজন এমনকি দশজনও থেকেছি আমরা। তবে ভাড়ার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। সাংগঠনিক সম্পাদক সাদেক মির্জাও দাবি করেন, তিনি শুধু দু-একবার রাজনৈতিক কারণে দেখা করতে সেখানে গিয়েছিলেন।

হোটেল কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, এই বিষয়ে যেহেতু একটি লিখিত অভিযোগ এসেছে, আমাদের সংগঠনের একটি শৃঙ্খলা কমিটি আছে, তারা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। শৃঙ্খলা কমিটি তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর সেই অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকরা বলছেন, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখানোর পর যদি নিজ দলের নেতারাই এমন চাঁদাবাজি, অর্থ আত্মসাৎ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন এবং দল যদি তাদের আশ্রয় দেয়—তবে তা হবে শহীদদের আত্মার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

Loading...
Loading...
আরো দেখুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.

Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; 01550707297 Advertisement: 41053012; 01550707292, E-mail: [email protected] [email protected]
🔝