প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য আবারও ভারতের পর্যটন ভিসা চালু হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, বাংলাদেশের একটি অংশের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগও দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভিসা চালু হওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক কূটনৈতিক বার্তা। তবে গত কয়েক মাসে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন, সীমান্তে উত্তেজনা এবং মূখ্যমন্ত্রী হওয়ার পূর্বে শুভেন্দু অধিকারীর বিভিন্ন সময়ের হুংকার ও বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশিদের নিয়ে তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে অনেক বাংলাদেশির মধ্যে নানা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভারতের কিছু কট্টরপন্থী বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিতর্কিত বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা আলোচনার কারণে অনেক বাংলাদেশি ভ্রমণ নিয়ে মানসিক অস্বস্তি অনুভব করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষক ভারত কার্নাড বাংলাদেশের রংপুর বিভাগকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়ে আলোচনায় আসেন। তিনি এমনকি আলোচনার মাধ্যমে না হলে সামরিক বিকল্পের কথাও উল্লেখ করেন। যদিও এটি ভারতের সরকারি নীতি নয়, তবুও বাংলাদেশে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের কিছু বিজেপি নেতার বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য, সীমান্ত রাজনীতিতে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণাও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব বক্তব্য ভারতের রাষ্ট্রীয় অবস্থানকে প্রতিফলিত না করলেও সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বাংলাদেশি পর্যটকদের একটি অংশের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে, ভারত সফরের সময় তারা উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর হয়রানি বা বিদ্বেষমূলক আচরণের শিকার হতে পারেন কি না। অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে, বাংলাদেশি পরিচয় প্রকাশ পেলে কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণের মুখোমুখি হতে হবে কি না। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বাংলাদেশবিরোধী বা বিদ্বেষমূলক প্রচারণার প্রভাব বাস্তব জীবনেও পড়তে পারে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বা সীমান্ত পরিস্থিতির অবনতি হলে ভ্রমণরত বাংলাদেশিদের প্রশাসনিক জটিলতা, অতিরিক্ত নজরদারি বা অন্যান্য ভোগান্তির মুখে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকেই। বিশেষ করে যারা পরিবার নিয়ে ভ্রমণে যেতে চান, তাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা বেশি দেখা যাচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উদ্বেগ থাকলেও এটিকে অতিরঞ্জিত করার সুযোগ নেই। ভারত প্রতিবছর লাখ লাখ বিদেশি পর্যটককে স্বাগত জানায়। বাংলাদেশ থেকেও অতীতে বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও পর্যটনের উদ্দেশ্যে দেশটিতে গিয়েছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্বিঘ্নে সফর শেষ করেছেন।
বিচ্ছিন্নভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের খবর সামনে এলেও সেগুলোকে পুরো ভারতের বাস্তবতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোও বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে।
ভারতের পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণাকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর দিকেই তারা এগোতে চায়।
তবে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—যখন ভারতের কিছু রাজনৈতিক নেতা বা কৌশলগত বিশ্লেষক বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রাসী বক্তব্য দিচ্ছেন, তখন বাংলাদেশি পর্যটকরা সেখানে কতটা স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা অনুভব করবেন?
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এই উদ্বেগের বড় অংশই রাজনৈতিক পরিবেশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের প্রভাব থেকে তৈরি হয়েছে। বাস্তবে অধিকাংশ বাংলাদেশি পর্যটক নিরাপদেই ভারত সফর করতে পারবেন বলেই ধারণা করা হয়। তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিছু মানুষের মধ্যে মানসিক শঙ্কা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তাদের মতে, এ ধরনের উদ্বেগ দূর করতে দুই দেশের সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীল বক্তব্য, ঘৃণামূলক প্রচারণা নিরুৎসাহিত করা এবং বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া প্রয়োজন। এতে সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বাড়বে এবং ভ্রমণ নিয়েও অনিশ্চয়তা কমবে।