📍 ঢাকা 📅 সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম
স্মরণকালের সর্বোচ্চ লোডশেডিং মধ্য রাতে
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম
দেশে স্মরণকালের সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে রোববার মধ্য রাতে। রাত ২টায় দেশে লোডশেডিং হয় ৩ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ওই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৭৩ মেগাওয়াট। রোববার সারা দিন গড়ে লোডশেডিং ছিল ২ থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট। 

এর আগে মে মাসে সারাদেশে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হয়েছিল। বর্তমান সরকারের সময়ে দেশে বিদ্যুতের এই সংকট চিন্তায় ফেলেছে সংশ্লিষ্টদের। গরম আরও বাড়লে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আওতার বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বর্তমানে ঢাকায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু জায়গায় সামান্য লোডশেডিং হয়। যা এখনো সহনীয় পর্যায়ে। তবে ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি বেশ নাজুক। বহু জেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ময়মনসিংহের শিল্প ও কৃষিপ্রধান এলাকায় দৈনিক গড়ে ১২-১৪ ঘণ্টা থাকে বিদ্যুৎহীন। সারাদেশে বিদ্যুতের জন্য চলছে হাহাকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকায়ও লোডশেডিং করার চিন্তা করছে সরকার। ঢাকায় লোডশেডিংয়ের আগে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিতে চায় বিদ্যুৎ বিভাগ। যদিও ঢাকায় লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানান বিদ্যুৎমন্ত্রী।

এদিকে, সার কারখানা বা অন্য কোনো খাতে গ্যাস কমিয়ে বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ময়মনসিংহ এলাকায় মারাত্মক লোডশেডিং কমাতে ইউনাইটেড পাওয়ার কোম্পানির দুই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

রোববার সংসদ সচিবালয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ওই সিদ্ধান্ত হয়। ওই বৈঠকে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সচিবসহ বিভিন্ন সিনিয়র কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 

এ দিন বিকেলে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, 'রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ। অন্য একটিতে উৎপাদন কম হচ্ছে। তাই লোডশেডিং বেড়েছে। তবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরোদমে চালাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের নির্দেশের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে খুলনার ৩০০ মেগাওয়াটের ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হয়েছে।'

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, অর্থ সংকট, গ্যাস সংকট এবং কয়লাভিত্তিক দুই কেন্দ্র ঠিকমতো চালু না থাকায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া পিডিবি এবং বিতরণ কোম্পানির মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও রয়েছে। সবকিছু মিলে গত ৫ বছরে এমন পরিস্থিতি হয়নি বিদ্যুৎ খাতে।

ময়মনসিংহের ভালুকার বড়াই এলাকা থেকে রবিন বড়ুয়া বলেন, 'ওই এলাকায় দিনে ৪-৫ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না। রাতে কখন বিদ্যুৎ আসে তা বলা কঠিন। এই গরমে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় সেখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারে লাটে উঠেছে। টেক্সটাইল এবং বিভিন্ন কৃষি খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।'

রাজধানীসংলগ্ন কেরানীগঞ্জের সাবান ফ্যাক্টরি এলাকার বাসিন্দা সোহেল আহমেদ বলেন, 'সেখানে প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। তার প্রশ্ন, রাজধানীতে কোনো লোডশেডিং নেই। কিন্তু রাজধানীর পাশের থানায় ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিং কেন?'

চট্টগ্রামের লোহাগড়া থেকে ইমন আহমেদ বলেন, 'গরমে এলাকার অবস্থা ভয়াবহ। বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। কখন বিদ্যুৎ আসে তার জন্য আমরা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করি।'

পরিস্থিতি এত খারাপ কেন
দেশে এখন পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজারের মতো। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সক্ষমতা আছে ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না কেন। এর উত্তরে পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় বাধা অর্থ সংকট। পিডিবির কাছে সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিল পাওনা ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারিখাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পাবে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। তারা পিডিবির কাছে ৭-৮ মাসের বিল পাওনা আছে।

বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, 'বেসরকারি কোম্পানিগুলো সরকারকে সহায়তা করে দেশকে লোডশেডিং মুক্ত করতে চায়। কিন্তু এ জন্য বিদ্যুতের বকেয়া বিল পরিশোধ করতে হবে। বকেয়া টাকা না পেলে কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য তেল কিনবে কীভাবে।'

পিডিবি জানিয়েছে, দেশে সরকারি-বেসরকারি খাতে ৪৩টি ছোট-বড় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। এর মধ্যে ডিজিটাল পাওয়ারের ১০২ মেগাওয়াট, দেশ এনার্জি চাঁদপুরের ২০০ মেগাওয়াট, টাঙ্গাইল ২২ মেগাওয়াট এবং অরিয়ন খুলনা ১০৫ মেগাওয়াটের কেন্দ্রে এক লিটার তেলও মজুত নেই। এছাড়া নাটোরে রাজ লংকা পাওয়ার কেন্দ্রে ৩ টন, ইপিভির ঠাকুরগাঁও ১১৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ৭৪ টন, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ারের মোল্লার হাট বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৯৮ টন, কুমিল্লা ৫২ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ৬ টন, ফেনী ১১৪ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ৩৯ টন, ওরিয়ন মেঘনাঘাট কেন্দ্রে ৩২ টন ফার্নেস অয়েল মজুত আছে। যা দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাবে না। বাকি বেশির ভাগ কেন্দ্রে ১০ থেকে ১৫ দিনের বেশি তেল মজুত নেই। এর বাইরে পিডিবির ১০টি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে শুধু শান্তাহার কেন্দ্র ১০ দিন চালু রাখার মতো তেল আছে। বাকিগুলোতে ১ থেকে ৮ দিন পর্যন্ত চালুর তেল রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও এখন উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৩ মেগাওয়াট (রোববার বেলা ১১টায়)। 

জানা গেছে, ময়মনসিংহে ইউনাইটেড গ্রুপের ২০০ এবং ১৫০ মেগাওয়াটের দুটি তেলভিত্তিক কেন্দ্র আছে। বকেয়া বিলের কারণে ওই কেন্দ্রে দুটি থেকে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এখন তাদের বকেয়া পরিশোধ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। ইউনাইটেড পিডিবির কাছে ৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পাওনা আছে।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৬ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা আছে দেশে। কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট টিউবের সমস্যার কারণে বন্ধ। বাকি ইউনিটও ৬০০ মেগাওয়াটের ক্ষমতা থাকলে উৎপাদন করছে ৪০০ মেগাওয়াট। নরেনকো কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করার কথা। কিন্তু সেটি এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করতে পারছে না। এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা। কিন্তু বকেয়া বিল এবং তাদের বিভিন্ন দাবি দাওয়ার কারণে কেন্দ্রটি সব সময় পুরোদমে চলছে না। সব মিলিয়ে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো।

গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আছে ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট। কিন্তু রোববার বেলা ১১টায় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ১১১ মেগাওয়াট। অন্যান্য বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাস বরাদ্দ ছিল ১২০ কোটি ঘনফুট থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট। এখন সেখানে দেওয়া হচ্ছে ৯১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট।

জানা গেছে, লোডশেডিং কমাতে রোববারের বৈঠকে বিদ্যুৎখাতে কমপক্ষে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। জ্বালানি বিভাগ বলছে ক্যাপটিভসহ বিদ্যুৎ খাতে দেশের উৎপাদিত ৬০ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হয়। এটা দেশের ক্ষতিকর। কারণ গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পসহ বিভিন্ন খাত ডুবতে বসেছে।

এমএ
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.

Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; 01550707297 Advertisement: 41053012; 01550707292, E-mail: [email protected] [email protected]
🔝