Saturday | 13 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Saturday | 13 June 2026 | Epaper
BREAKING: বাজেট ঘোষণার পর কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি: প্রধানমন্ত্রী      হামের উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ৭৯৬      দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করাই বিরোধী দলের লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী      ক্রিকেটার নাঈমকে মারধরের ঘটনায় মামলা, এসআইসহ প্রত্যাহার ৩      পাতিলী খাল পুনঃখননের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী      কক্সবাজার পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      বার কাউন্সিলের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ জাইমা রহমান      

অর্থনীতিকে টেনে তোলার বাজেট: বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করার যুগান্তকারী উদ্যোগ

প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৩:০২ পিএম   (ভিজিট : ৩৬)

দীর্ঘ দুই দশক পর গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছে বিএনপি সরকার। দেশের অর্থনীতি যখন গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—বিশেষ করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের নীতিগত স্থবিরতা, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগে খরা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জনজীবন যখন বিপর্যস্ত—ঠিক তখনই এ বাজেট পেশ করা হয়েছে।

সংকটের এই সময়ে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জনমনে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা এবং বেসরকারি খাতের টেকসই উন্নয়নে বাজেটে কিছু সুনির্দিষ্ট ও যুগান্তকারী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

যেকোনো অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের প্রথম শর্ত হলো সমস্যার সঠিক উৎস চিহ্নিত করা। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেটে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণগুলো বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে সংকট থেকে উত্তরণের জন্য যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, তা সময়োপযোগী বলেই প্রতীয়মান হয়। তিনি সঠিকভাবেই অনুধাবন করেছেন যে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে হলে বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার বিকল্প নেই। বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত বেসরকারি খাতই যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মূল চালিকাশক্তি, তা বাজেটে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানির বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারের মাধ্যমে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা এ বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

নিয়মনীতি ও আইনি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতা দূর করার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যও রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ-সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। উৎসে করকে চূড়ান্ত অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করায় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণ হয়েছে।

এ ছাড়া শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর ৪ শতাংশে হ্রাস, ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর ০.৫ শতাংশ নির্ধারণ, আগামী পাঁচ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা এবং স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) খাতে করছাড়ের সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং ত্রৈমাসিক অনলাইন ভ্যাট রিটার্নের বিধানও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সিএমএসএমই (CMSME) খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ লাখ টাকা ও নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ই-লোন (E-Loan) চালুর সিদ্ধান্ত প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ফ্ল্যাট রেটে টার্নওভার কর এবং আলাদা ভ্যাট রিটার্ন ফরম কর ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ করবে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে এ পথ মোটেও মসৃণ নয়। বাজেট বাস্তবায়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমলাতান্ত্রিক বাধা এবং বিগত সরকারের রেখে যাওয়া নীতিগত স্থবিরতা দূর করা। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা।

বিগত সরকারের আমলে দেশের শিল্প খাতে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে মব জাস্টিস বা গণ-সহিংসতার কারণে বহু কলকারখানা বন্ধ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। এর ফলে লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন।

বেসরকারি খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের কারণে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে। বিনিয়োগের পরিবেশ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে দীর্ঘ দেড় বছরে উল্লেখযোগ্য নতুন বিনিয়োগ আসেনি। তদুপরি ব্যাংক ঋণের সুদের হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিনিয়োগ কার্যক্রম আরও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে দেশের অনেক বড় শিল্পগোষ্ঠী আর্থিক সংকটে পড়ে এবং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।

বিগত ১৮ মাসে নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলোর অনেকই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে ছিল। ফলে বেসরকারি খাত কার্যত এক অচলাবস্থার মধ্যে পড়ে। তাই এ বাজেট সফল করতে হলে সেই অচলাবস্থা দূর করাই হবে প্রধান কাজ।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ব্যবসা ও রপ্তানি সম্প্রসারণের জন্য শিল্প উদ্যোক্তাদের নিয়মিত বিদেশ সফর প্রয়োজন। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির বিদেশ যাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ ২১ মাস ধরে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেশের বাণিজ্য খাতের জন্য ক্ষতির কারণ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এসব নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়নি বলে ব্যবসায়ী মহলের একাংশের অভিযোগ। বিনিয়োগ বাড়াতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

বেসরকারি খাতে একটি সম্পূর্ণ ভয়হীন ও নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি না করতে পারলে অর্থমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

তবে সরকার এবারের বাজেটে আমলাতান্ত্রিক হয়রানি কমাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি সংস্কারের প্রস্তাব করেছে। ব্যবসা শুরুর নিবন্ধন, বিভিন্ন অনুমোদন ও ছাড়পত্রসহ সরকারি সেবাগুলো সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ছাড়পত্র না দিলে আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত (Auto-approved) বলে গণ্য হবে।

কোম্পানির নাম ছাড়পত্র, নিবন্ধন আবেদন, ফি পরিশোধ এবং সনদ প্রদান সম্পূর্ণ অনলাইনে সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানি নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হবে। নতুন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য অনলাইনভিত্তিক প্রাথমিক অনুমোদন ব্যবস্থাও চালু করা হবে, যাতে উদ্যোক্তারা দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে পারেন। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা সহজ করতে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স সেবা ধাপে ধাপে কেন্দ্রীয় অনলাইন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।

এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও সময়োপযোগী। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক ভালো উদ্যোগও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। একটি নতুন কারখানা স্থাপনে ভূমি অফিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং পরিবেশ অধিদপ্তরসহ একাধিক দপ্তরের অনুমোদন নিতে হয়। জামানত জমা দিয়েও বছরের পর বছর গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণ এমন হয় যেন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করাই একটি সমস্যা। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি।

বাজেটের নির্দেশনাগুলো মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা যায়। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও সরাসরি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। বাস্তবতা ও প্রতিবেদনের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়ার পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তার এ পদক্ষেপ কার্যকর ও প্রশংসনীয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে গতি ফেরাতেও এমন নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। সরকার লাইসেন্স ও ছাড়পত্র প্রদানের যে সময়সীমা নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণে একই ধরনের কঠোরতা প্রয়োজন। বাজেট বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং সরকারের উন্নয়ন-অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ, ভীতিহীন পরিবেশ সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ-সহায়ক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাই এ মাইলফলক বাজেটকে সফল করতে পারে।





LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close