দীর্ঘ আলোচনা, নানা জল্পনা-কল্পনা এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে ঘোষিত হলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। প্রস্তাবিত এই বাজেটকে এক কথায় বলা যায়—‘আকারে বিশাল, কিন্তু বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জে ভরা’। সরকারের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা পূরণের বড় লক্ষ্য সামনে রেখে বাজেটটি সাজানো হলেও, ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এবারের বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এর বিশাল আকার। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের চাহিদা মেটাতে প্রতিবছরের মতো এবারও বড় অঙ্কের বাজেট পেশ করা হয়েছে। তবে বাজেটের আকার যত বড় হয়েছে, ততই বেড়েছে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ।
বিশাল এই ব্যয়ের বিপরীতে অভ্যন্তরীণ খাত (যেমন: এনবিআর) থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় নিয়ে বরাবরের মতোই প্রশ্ন রয়েছে। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান বা ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে, যা পূরণে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বাজেটের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও উদ্বেগের বিষয় হলো অভ্যন্তরীণ ঘাটতি পূরণের উৎস। এবারও বাজেট ঘাটতির একটি বড় অংশ ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়ে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যদি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের বেসরকারি খাতের ওপর। সাধারণ ব্যবসায়ী ও নতুন উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও বাধাগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ সরবরাহ বাড়িয়ে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেলে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
তবে সব শঙ্কার মধ্যেও এই বাজেটকে ঘিরে কিছু ইতিবাচক প্রত্যাশা রয়েছে। বাজেটে বেশ কিছু ক্ষেত্রে স্বস্তির বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। চলমান বড় বড় মেগা প্রকল্প দ্রুত শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে গতি আনতে পারে। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা এবং ভাতার পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে, যা প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। দেশীয় শিল্প সুরক্ষা এবং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে কিছু ক্ষেত্রে কর রেয়াত ও শুল্ক সহায়তার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেট কেবল ‘কাগজে-কলমে’ পাস করার চেয়ে বাস্তবায়ন করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ওপর এমনিতেই চাপ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাজেট সফল করতে সরকারকে তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। করের আওতা বাড়িয়ে কর ফাঁকি বন্ধ করতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধ করা জরুরি। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমিয়ে বৈদেশিক সহজ শর্তের ঋণ ও অনুদান পাওয়ার প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট একদিকে যেমন সমৃদ্ধ আগামীর ‘আশা’ দেখায়, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে ‘শঙ্কা’ও তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত সরকারের সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে—এই বাজেট দেশের জন্য আশীর্বাদ হবে, নাকি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়াবে।