রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মা নদীবেষ্টিত চকরাজাপুর ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডের প্রায় ৫ হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। আতারপাড়া, চৌমাদিয়া ও দিয়ারকাদিরপুর চরের বাসিন্দাদের জন্য নেই কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র কিংবা জরুরি চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা। ফলে অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের চিকিৎসার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পদ্মা নদী ও দুর্গম চর পাড়ি দিতে হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চকরাজাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড আতারপাড়া, ২ নম্বর ওয়ার্ড চৌমাদিয়া এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ড দিয়ারকাদিরপুরে প্রায় ৭৫০টি পরিবার বসবাস করে। এসব এলাকায় জনসংখ্যা প্রায় ৫ হাজার ৫০ জন। অথচ এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। জটিল রোগে আক্রান্ত রোগী কিংবা প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসার জন্য প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অথবা ৮০ কিলোমিটার দূরের রাজশাহী শহরে যেতে হয়।
চরবাসীরা জানান, বর্ষা মৌসুমে নৌকায় যাতায়াত তুলনামূলক সহজ হলেও শুষ্ক মৌসুমে বিশাল চর পায়ে হেঁটে অতিক্রম করে আবার নৌকায় নদী পার হতে হয়। এ সময় বিভিন্ন স্থানে টোল ও নৌকা ভাড়া দিতে হয়। ফলে চিকিৎসার খরচের সঙ্গে যাতায়াত ব্যয়ও বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
আতারপাড়া চরের বাসিন্দা ছলেমান আলী বলেন, “বাড়িতে অসুস্থ মা আছে। রাতে অসুস্থ হলে সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে। কখন নৌকা পাব, কীভাবে চর পার হব, কখন হাসপাতালে পৌঁছাব—এই চিন্তায় থাকতে হয়। অনেক সময় রোগী পথেই মারা যায়।”
চৌমাদিয়া চরের সোহেল রানা বলেন, “চরের বেশিরভাগ মানুষ কৃষিকাজ ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। দূরে চিকিৎসা নিতে গেলে অনেক খরচ হয়। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে যান।”
দিয়ারকাদিরপুর চরের বাসিন্দা বেল্লাল হোসেন জানান, এক প্রসূতি নারীকে গভীর রাতে হাসপাতালে নেওয়ার পথে নৌকাতেই সন্তান জন্ম হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। পরে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসক মাসুম মোল্লা বলেন, “আমরা সাধারণ চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা প্রসূতি জটিলতার মতো ক্ষেত্রে কিছুই করার থাকে না। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন হয়। কিন্তু দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।”
চকরাজাপুর ইউনিয়নের আতারপাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আবদুর রহমান দর্জি বলেন, “স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও এই এলাকার মানুষের জন্য কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে ওঠেনি। চিকিৎসাসেবার অভাবে চরবাসীরা হাতুড়ে চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক মানুষ শুধু যাতায়াত খরচের ভয়ে হাসপাতালে যেতে চান না।”
তিনি জানান, তিনটি ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৯১৬ জন। এসব এলাকায় একটি মাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও নেই। স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা আরও নাজুক।
এ বিষয়ে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, “চকরাজাপুর ইউনিয়নে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অন্যটির কাজ চলমান রয়েছে। তবে আতারপাড়া, চৌমাদিয়া ও দিয়ারকাদিরপুরে কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এছাড়া নদীগর্ভে বিলীন হওয়া কমিউনিটি ক্লিনিক পুনঃস্থাপন এবং একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।”
স্থানীয়দের দাবি, চরাঞ্চলের হাজারো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন করা হোক। অন্যথায় জরুরি চিকিৎসার অভাবে প্রাণহানির ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
এআই/আরএন