চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন নগরীতে জুলাই আগস্ট বিপ্লবের গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগকে 'ডাহা মিথ্যা' ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন।
সোমবার টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিং ও সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ কথা বলেন।
মেয়র বলেন, 'আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি মহল 'ঘোলা পানিতে মাছ শিকার' করার চেষ্টা করছে।'
তিনি বলেন, 'জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার জন্য কখনো কোনো নির্দেশ দেইনি এবং ভবিষ্যতেও দেবনা।'
তিনি আরও বলেন, 'নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ নিয়মিত ভাবে নির্দিষ্ট সময় পর পর বিভিন্ন পিলার ও দেয়াল থেকে পোস্টার ব্যানার অপসারণ ও রং করার কাজ করে থাকে। টাইগারপাসসহ যেসব স্থানে রং করা হয়েছে, সেখানে মূলত পোস্টার দিয়ে ঢাকা ছিল এবং দৃশ্যমান কোনো গ্রাফিতি ছিল না।'
মেয়র বলেন, 'জুলাই আগস্টের চেতনার বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি নিজে দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে আন্দোলন করেছি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম আমারই অনুসারী ছিল।'
তিনি বলেন, 'কেউ গ্রাফিতি করতে চাইলে আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে শৈল্পিক ও মানসম্মত গ্রাফিতি আঁকতে পারে।' এ ধরনের উদ্যোগে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে কিংবা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে অর্থায়নের আশ্বাসও দেন।
তিনি আরও বলেন, 'অপরিচ্ছন্ন হাতের লেখার চেয়ে পরিকল্পিত ও শৈল্পিক গ্রাফিতি শহরের সৌন্দর্য ও ভাবমূর্তি রক্ষা করবে।'
আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা সহায়তার প্রসঙ্গ তুলে ধরে ডা. শাহাদাত বলেন, '০৪ অগাস্ট যখন অনেক হাসপাতাল আহতদের নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল, তখন তিনি নিজ উদ্যোগে ট্রিটমেন্ট ও হলি হেলথ হাসপাতালে আহতদের ভর্তি করান। এছাড়া ০৬ অগাস্ট চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে গিয়ে আহতদের ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। শহীদ পরিবারগুলোকেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহযোগিতা করা হয়েছে।'
এনসিপির সাম্প্রতিক বক্তব্য ও কর্মসূচির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'সামনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটা ফায়দা লুটার জন্য এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার জন্যই তারা এই কাজ করছে।'
নিজের মেয়াদের বিষয়ে মেয়র বলেন, 'আদালতের নির্দেশে আইনগত ভাবে বৈধ মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি এবং বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী আমার মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত।' তবে দ্রুত একটি অবাধ, সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচনের দাবি জানাই।
লালখান বাজার এলাকায় রোববার রাতে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'সংঘর্ষ এড়াতে আমি নিজেই ঘটনাস্থলে গিয়ে কর্মীদের সরিয়ে নিয়ে আসি। এই শহরটা সবার। আমরা একটি নিরাপদ ও সুন্দর শহর গড়তে চাই। সাংঘর্ষিক কোনো কিছুর জন্য আমরা আগ্রহী নই।'
বিকেলে একই বিষয়ে মেয়র আবারও মিডিয়াকে টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন। সে সময় মেয়রের সাথে ছিলেন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ইয়াছিন চৌধুরী লিটন, সদস্য ইসকান্দার মীর্জা এবং কামরুল ইসলাম।
মেয়র বলেন, 'রোববার থেকে সোমবার পর্যন্ত আমার কোনো বক্তব্যে গ্রাফিতি অঙ্কনের বিরোধিতা খুঁজে পাবেন না। আমি বরং বলেছি, গ্রাফিতি হোক নান্দনিক ভাবে, যাতে মানুষের নজরে পড়ে এবং শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। চট্টগ্রামকে একটি 'ক্লিন, গ্রীন, হেলদি ও সেফ সিটি' হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে সিটি কর্পোরেশন। টাইগারপাস এলাকা নগরীর প্রবেশমুখ হওয়ায় এখানে বিদেশি কূটনীতিক ও বিনিয়োগকারীরা আসেন। তাই এ এলাকার সৌন্দর্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই অগাস্টের চেতনাকে ধারণ করে যারা গ্রাফিতি করতে চায়, তারা অবশ্যই করবে। আর্ট কলেজের শিক্ষার্থী ও দক্ষ শিল্পীদের দিয়ে এগুলো করলে শহরের সৌন্দর্য আরও বাড়বে।'
তিনি বলেন, 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা গ্রাফিতি করার বিষয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আমি সবাইকে ইতিবাচক ভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছি।'
ডা. শাহাদাত বলেন, 'পুলিশ একটি আলাদা সংস্থা। তারা হোম মিনিস্ট্রির অধীনে কাজ করে। রোববার রাতের ঘটনার প্রেক্ষিতে তারা ১৪৪ ধারা জারি করেছিল। আমরা আইনকে সম্মান করি এবং কাউকে সংঘাতে জড়াতে চাইনি।'
তিনি বলেন, 'দুপুরে একটি ভিডিওতে পুলিশের সঙ্গে কয়েকজন তরুণীর বাগবিতণ্ডা দেখতে পেয়ে তিনি পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার অনুরোধ জানান। পরে পুলিশ কমিশনার তাকে জানান- ঢাকা থেকে অনুমতি পাওয়ার পর ১৪৪ ধারা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'যারা গ্রাফিতি করতে আগ্রহী তারা অবশ্যই করবে, তবে সেটা যেন দৃষ্টিনন্দন হয় এবং কাউকে অযথা দোষারোপ বা মিথ্যাচারের মাধ্যম না হয়। আমরা সম্প্রীতি, ঐক্য ও সাম্যের শহর গড়তে চাই। কোনো ধরনের অনিরাপত্তা বা বিভাজনের রাজনীতি আমরা চাই না। সবাই মিলে নিরাপদ ও সুন্দর নগর গড়ে তুলতে হবে।'
মেয়র বলেন, 'নগরীর বিভিন্ন পিলার ও দেয়ালে পোস্টার লাগিয়ে নোংরা করা হয়েছে।' যেসব জায়গায় পুরানো গ্রাফিতির ওপর পোস্টার লাগানো হয়েছে, সেসব স্থান পরিষ্কার করে নতুন করে গ্রাফিতি আঁকার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, 'সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে থেকে এবং ব্যক্তিগত ভাবে আমি সবসময় ভালো উদ্যোগের পাশে থাকব। প্রয়োজন হলে আর্থিক সহযোগিতাও করব।'
সোমবার সন্ধ্যায় মেয়র টাইগারপাস এলাকায় সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত গ্রাফিতি অংকন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
সে সময় শিক্ষার্থী, তরুণ শিল্পী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এমএ/এমএ