উপকূলের দুর্যোগ মৌসুম শুরু হয়েছে। আর এর আগেই ভোলার চরফ্যাশনের ঢালচরে ভূমিহীনদের ঘর-বাড়ি রক্ষার বা বদলের হিড়কি পড়ে গেছে। দুর্যোগের এই সময়টাতে চরফ্যাশন উপজেলার বিছিন্ন দ্বীপ চর ইউনিয়নের মেঘনা নদীর তীরের মানুষরা তাদের ঘর-বাড়ি মেরামতে ব্যস্ত থাকেন। অনেকেই তাদের ঘর-বাড়িকে ঝড় প্রতিরোধী করে তোলার জন্য মজবুত করেন।
এই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষরা বর্ষার ঝুঁকি এড়াতে এবং নদী ভাঙন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে আরও অনেক পদক্ষেপ নেন। তবুও তাদের দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হয়। তাদের এই নাজুক সময়টা নানা সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়।
বুধবার চরফ্যাশন উপজেলার বিচ্ছিন্ন সাগর মোহনার ঢালচর ইউনিয়নের ভদ্রপাড়া এলাকার গিয়ে দেখা যায়, মেঘনা নদীর তীরে বাঁশের কঞ্চি ও ত্রিপল দিয়ে ঝুঁপড়ি ঘর নির্মাণ করে স্ত্রী, তিন সন্তান ও এক ছেলে বউ ও নাতি নিয়ে বসবাস করছেন কাঞ্চন মুন্সি।
তিনি জানান, তিনি চার সন্তানের জনক। এক মেয়ে ও তিন ছেলে তার। আগে তার ভালো বসতঘর, ফসলি জমি ছিল। কিন্তু মেঘনা নদী তার বসতভিটা, ফসলি জমি নিয়ে গেছে। এ পর্যন্ত চার বার ভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়েছেন তিনি। ১০ দিন আগে তিনি মেঘনা নদীর পাশে সন্তানদের নিয়ে ওই আশ্রয়টি নির্মাণ করে বসবাস করছেন।
তিনি আরও জানান, দেনায় জর্জড়িত তিনি দুই সন্তান নিয়ে মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করে কোনোরকম খেয়ে বেঁচে আছেন। বর্তমানে ঘর নির্মানের টাকা নেই তাই বাধ্য হয়ে বাঁশ কাইটা তাঁবুর মতো করাই থাকতেছি। এহন যেখানে থাকতেছি এইডা আবার পরের জমি। উডাই দিলে কই যামু জানি না। সরকার যদি আমারে একটু জমি দিতো তাইলে ধার-দেনা ও ঋণ নিয়া ঘর উঠাইয়া থাকতে পারতাম।
তার স্ত্রী আয়েশা বেগম জানান, নদী আমাগো জমি, ঘর সব নেওয়ার পর থেকে কয়েকবার ঋণ কইরা আমার স্বামী অন্য জমিতে ঘর তুলছিল। তাও আবার নদী নিয়ে গেছে। এখন তো আমরা নিঃস্ব।
কাঞ্চন মুন্সির পুত্রবধূ শিরিনা বেগম জানান, বাবা-মা শ্বশুড়ের জমিজমা ও সুন্দর ঘর দেইখা বিয়ে দিছে। এখন তো সব নদীতে লইয়া গেছে। আমরা এহন নদীর পাড়ে ত্রিপলের তাঁবুর মতো ঘরে থাকি। সামনে ঝড়ের দিন আছে, আমরা কই যামু?
অন্যদিকে, সব হারিয়ে ঢালচর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিনগর এলাকার বন বিভাগের বাগানে ঝুঁকি নিয়ে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন জেলে মো. হুমায়ুন কবীর।
তিনি জানান, এই পর্যন্ত মেঘনা নদীর ৮-১০ বার ভাঙনের কবলে পড়েছেন। বাবা-দাদার জমি, বসতঘর ও নিজের জমানো টাকা সবই হারিয়েছেন মেঘনা নদীর ভাঙনের কারণে। তাই জমি কেনার টাকা না থাকায় বন বিভাগের বাগানের এক ফাঁকে টিন, বাঁশ ও ত্রিপলের বেড়া দিয়ে ঝুঁপড়ি ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। বৃষ্টি ও ঝড়ের সময় ঘরে পানি ঢুকে সব ভিজে যায়।
তিনি আরও জানান, বন বিভাগের বাগানে বসবাস করায় রাতের বেলায় সাপ, বন্যপ্রাণীর আতঙ্কে থাকতে হয়। এছাড়া বন বিভাগ প্রতিদিনই তাদের এখান থেকে উঠে যেতে বলে।
ঢালচর দ্বীপের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন (৫৫) এ বছর বর্ষা আসার আগে তার বাড়ি ঠিক করতে এক লাখ টাকা খরচ করেছেন। ঢালচরের ইব্রাহিম মিয়া (৫৮) তার বাড়ি ঠিক করতে একই পরিমাণ টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু ঝড়ো মৌসুম শুরু হতেই তাদের দু'জনকেই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছে।
পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, জলবাযু পরিবর্তনের কারণে এই দুর্যোগের মাত্রা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও ক্ষয়ক্ষতি কমানো বা ভয় দূর করা সম্ভব হচ্ছে না। ১০-২০ বছর আগে উপকূলের মানুষেরা যেমন আতঙ্কে ছিলেন, এখনও তাদের সেই একই ভয় রয়েছে। তারা প্রান্তিক অবস্থানে নিরাপদে ও শান্তিতে বসবাস করতে পারছেন না। প্রতি বছর জলোচ্ছ্বাসের কারণে বিপুল পরিমাণ উপকূলীয় সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মৌসুমী দুর্যোগ আর নদীর ভাঙন প্রতি বছর চরফ্যাশনের ঢালচর উপকূলের মানুষকে নিঃস্ব করে।
এই মানুষরা এক স্থান থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্য স্থানে ঘর বাঁধেন। কিন্তু সে ঘর আবার নদীর ভাঙনে হারায়। বাস্তুচ্যুতি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জীবন চরম ভাবে বিপর্যস্থ করে। কিন্তু তাদের জীবন জীবিকা ও কর্মসংস্থানের জন্য নেই যথাযথ সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা। অথচ ঢালচর ইউনিয়নে সরকারি খাস জমি আছে কিন্তু বন্দোবস্ত দেয়নি। যার কারণে জমিগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। এখানকার বাস্তুচ্যুত মানুষ জমির অভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। ঢালচর ইউনিয়নের বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসবাস। এর মধ্যে বেশির ভাগ মানুষই ভূমিহীন।
চরফ্যাশন উপজেলা নিবাহী র্কমর্কতা (ইউএনও) রোমান আফরোজ জানান, ঢালচরের ভূমিহীন মানুষ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী খাস জমি পাওয়ার জন্য আবেদন করলে তা যাচাই-বাছাই করা হবে। যাচাই-বাছাইতে যারা খাস জমি পাওয়ার যোগ্য হবে আমরা তাদের মাঝে খাস জমি বন্দোবস্ত দেব।
এসএফ/এমএ