“চা শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে”—এই দাবিতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে মানববন্ধন করেছেন শত শত চা শ্রমিক। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা ক্যামেলিয়া হাসপাতাল দ্রুত চালুর দাবিতে মঙ্গলবার সকাল ৯টায় শমশেরনগর চা বাগান ফ্যাক্টরির সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
শমশেরনগর, কানিহাটি, বাঘীছড়া, দেওছড়া ও ডাবলছড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত, শ্রমিক, ছাত্র ও যুবকদের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে প্রায় পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিক অংশ নেন। ব্যানার-ফেস্টুন ও স্লোগানে তারা হাসপাতালটি দ্রুত চালুর দাবি জানান।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন শমশেরনগর চা বাগান পঞ্চায়েতের সভাপতি শ্রীকান্ত কানু গোপাল। বক্তব্য দেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি, সাবেক ইউপি সদস্য ও শ্রমিক নেতা সীতারাম বিন, শিক্ষক ও শ্রমিক নেতা নির্মল দাস পাইনকা, শমশেরনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইয়াকুব মিয়া, মহন লাল রবিদাস, ইউপি সদস্য নমিতা সিংহ, শ্রমিক সর্দার জামাল মিয়া, যুবনেতা সজল কৈরি ও বাবলু মাদ্রাজী প্রমুখ।
এছাড়া উপস্থিত ছিলেন দেওছড়া চা বাগানের সভাপতি শংকর রবিদাস, কানিহাটি চা বাগানের সভাপতি প্রতাপ রিকিয়াসন, বাঘীছড়া চা বাগানের সভাপতি লচমী রবিদাস এবং ভাবলছড়া চা বাগানের সভাপতি সঞ্জু তাঁতি।
বক্তারা জানান, গত ২৬ মার্চ রাতে শমশেরনগর চা বাগানের শ্রমিক বাবুল রবিদাসের ১৩ বছর বয়সী মেয়ে ঐশী রবিদাস অসুস্থ হয়ে ক্যামেলিয়া হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরদিন সকালে তার মৃত্যু হলে ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একটি অংশ হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্টাফদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ওই ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার অজুহাতে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেয়, যা এখনো চালু হয়নি।
তাদের অভিযোগ, হাসপাতালটি বন্ধ থাকায় কমলগঞ্জ ও আশপাশের ৩৫টি চা বাগানের প্রায় এক লাখ শ্রমিক ও তাদের পরিবার চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন। জরুরি চিকিৎসা, মাতৃসেবা, শিশু চিকিৎসা এবং দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
শ্রমিক নেতারা বলেন, অধিকাংশ চা শ্রমিকের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তারা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন না। ফলে সাধারণ জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে প্রসূতি মায়েদের জটিলতা পর্যন্ত নানা সমস্যায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, “চা শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তাদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও অনিশ্চিত। দ্রুত হাসপাতাল চালু না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
শ্রমিক নেতা সীতারাম বিন, নির্মল দাস পাইনকা ও ইউপি সদস্য ইয়াকুব মিয়া বলেন, “একটি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার পরিবার। এটি বন্ধ থাকা মানে পুরো শ্রমিক জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।”
এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালটি চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চা শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, দেশের চা শিল্পে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত। অধিকাংশ বাগানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, ওষুধ ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিক ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের রপ্তানি আয় ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া সত্ত্বেও চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়। তাদের মতে, ক্যামেলিয়া হাসপাতাল পুনরায় চালু করা শুধু একটি হাসপাতাল খোলার বিষয় নয়, বরং হাজারো শ্রমিক পরিবারের ন্যূনতম স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করারও দাবি।
এসএস/এসআর