বাগেরহাটের শরণখোলায় সংখ্যালঘু (হিন্দু) একটি পরিবারের ওপর হামলা, বসতঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে ভুক্তভোগী রবীন ঢালী ২৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও বেশ কয়েকজনের নামে মামলাটি দায়ের করেন।
এ ঘটনায় উপজেলার উত্তর রাজাপুর গ্রামের জামাল শিকদারের ছেলে রাজু শিকদার এবং রাজৈর গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে নাইম ইসলাম নামে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বর্বর এই হামলার ঘটনাটি ঘটে সোমবার (৪ মে) দুপুরে উপজেলার ধানসাগর ইউনিয়নের রতিয়া রাজাপুর গ্রামে। ঘটনার পরের দিন (মঙ্গলবার) দুপুরে বাগেরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি ভুক্তভোগী পরিবারসহ আতঙ্কিত হিন্দু সম্প্রদায়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস প্রদান করেন।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রবীন ঢালীর সঙ্গে তিন-চার বছর ধরে একই এলাকার প্রভাবশালী সোবাহান হাওলাদারের জমিজমা নিয়ে বিরোধ ও মামলা চলে আসছে। এর জেরে সোবাহান হাওলাদার, তার দুই ছেলে মিরাজ ও আব্দুল্লাহ এবং দুই ভাই সরোয়ার ও দেলোয়ারের নেতৃত্বে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি বাহিনী রবীনের বাড়িতে হামলা চালায়। তারা দা, হাতুড়ি, শাবল ও লাঠিসোটা নিয়ে প্রথমে বসতঘর ভাঙচুর শুরু করে। ঘরের চালা, বেড়া, চাটাই ও আসবাবপত্র ভেঙে চুরমার করে ফেলে। এতে বাধা দিলে সন্ত্রাসীরা বাড়ির নারী সদস্যদের মারধর করে।
সন্ত্রাসীদের হামলায় আহতরা হলেন—রবীন ঢালীর স্ত্রী সীমা রাণী (৩৫), মা দুলালী রাণী (৭০), নানী বেলকা রাণী (৯০) এবং তার দুই খালা বিমলা রাণী (৬০) ও লীলা রাণী (৬৫)। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
রবীন ঢালী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ঘটনার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম না। ব্যক্তিগত কাজে পাশের মোরেলগঞ্জ উপজেলায় গিয়েছিলাম। এই সুযোগে সোবাহান হাওলাদার উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে এনে আমার বাড়ি জবরদখলের চেষ্টা করেন। সন্ত্রাসীরা বসতঘর, আসবাবপত্র ও মালামাল সব ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে। দুটি ট্রাঙ্কে থাকা স্বর্ণালঙ্কার ও জমির দলিলপত্র লুট করে নিয়ে গেছে। বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানে বসবাসের কোনো উপায় নেই। এ অবস্থায় অন্যের বাড়িতে থাকতে হচ্ছে।
রবীন ঢালী আরও বলেন, আমি দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে গার্মেন্টসে কাজ করতাম। সেই ফাঁকে আমার দলিলকৃত জমির মধ্য থেকে ১৫ শতাংশ জমি প্রভাবশালী সোবাহান হাওলাদার তার নামে রেকর্ড করিয়ে নেন। পরবর্তীতে বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয়ভাবে বহুবার সালিস বৈঠক হয়। কিন্তু কোনো সমাধান না হওয়ায় বাগেরহাট আদালতে বাটোয়ারা মামলা করা হয়। মামলা চলমান থাকা অবস্থায় তারা আমার বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়ে আমাকে উচ্ছেদ করে জমি দখলের চেষ্টা চালায়। খবর পেয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা ছুটে এলে তাদের বাধার মুখে সন্ত্রাসীরা চলে যায়। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নির্মল হালদার ও বিজন হালদার বলেন, আমাদের চোখের সামনে যেভাবে ত্রাস সৃষ্টি করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে, তা আমাদের সঙ্গে ১৯৭১ সালেও এমন হয়নি। এতটা আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় তখনও ছিলাম না। কিন্তু আজ স্বাধীন দেশে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ঘটনার পর থেকে আমরা চরম আতঙ্কে আছি। সোবাহানের সন্ত্রাসী বাহিনীর কঠোর বিচার এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাই সরকারের কাছে।
উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি বাবুল দাস ও সাধারণ সম্পাদক গোপাল কর্মকার বলেন, হিন্দুপাড়ার এই ঘটনাটি সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার পাশাপাশি ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং স্থানীয় বাসিন্দা মহিউদ্দিন বাদল বলেন, হামলার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রবীন ঢালীর বাড়িতে ছুটে যাই। সেখানে গিয়ে ভাঙচুরের দৃশ্য দেখতে পাই। রবীনের প্রতিপক্ষ এবং বহিরাগত অনেকেই সেখানে ছিল। তাদের বাধা দিয়েও ফেরানো যায়নি। এরা কোনো দলের লোক নয়, এরা সন্ত্রাসী। এই ঘটনায় যাতে নিরীহ কোনো লোক না ফাঁসে এবং প্রকৃত দোষীদের শাস্তি হয়—এটাই চাই।
শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামিনুল হক বলেন, হামলার খবর পেয়ে রবীন ঢালীর বাড়িতে ছুটে যাই। সেখানে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোটা জব্দ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ঘটনায় রবীন ঢালী বাদী হয়ে ২৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও বেশ কয়েকজনের নামে মামলা করেছেন। দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে।
এমআর/আরএন