গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণের সব কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে উদ্যান ও আশপাশের এলাকায় বর্জ্য ফেলা থেকেও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ডেপুটি রেঞ্জার (রেঞ্জ কর্মকর্তা) আরিফুল ইসলাম বলেন, 'সোমবার মহামান্য হাইকোর্ট এ বিষয়ে একটি রুল জারি করেছেন।'
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সীমানা প্রাচীর ভেঙে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে বর্জ্য ফেলার স্থান (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন- এসটিএস) নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের (জিসিসি) বিরুদ্ধে।
গাজীপুর মহানগরীর রাজেন্দ্রপুর এলাকায় প্রায় ৫ হাজার ২২ দশমিক ২৯ হেক্টর বনভূমি নিয়ে ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক ও গবেষকরা নিয়মিত এই উদ্যানে আসেন।
গত শুক্রবার (০১ মে) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এক্সেভেটর দিয়ে খনন কাজ চলছে। উদ্যানে প্রায় ৫০ ফুট সীমানা প্রাচীর ভেঙে পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শাল-গজারী গাছ কেটে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজও চলছে। টিন সেড দিয়ে একটি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে কয়েকজন কর্মী কাজ তদারকি করছিলেন।
কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ রয়েছে।
শ্রমিক রকিব হাসান বলেন, 'শুক্রবার হওয়ায় কর্মী সংখ্যা কম থাকলেও ২০ জন কাজ করছেন।'
শ্রমিক সবুজ মিয়া বলেন, 'মহাসড়ক থেকে বাউন্ডারি ওয়াল ভেঙে মাটির নিচে চার ফুট গভীর পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।'
আরেক শ্রমিক কবির হোসেন বলেন, 'বন বিভাগের প্রায় ৫০ ফুট দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে ২৬০ ফুট দীর্ঘ নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে।'
সাইট সুপারভাইজার মোহাম্মদ ইফতি বলেন, 'সেখানে একটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।' তিনি জিসিসির পক্ষ থেকে কাজ তদারকি করছেন।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, গত ১১ এপ্রিল একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের থাকার জন্য একটি শেড নির্মাণ করে। পর দিন ১২ এপ্রিল অভিযান চালিয়ে সেটি ভেঙে দেয় বন বিভাগ। তবে ১৩ এপ্রিল বিপুল সংখ্যক লোকজন নিয়ে এসে সীমানা প্রাচীর ভেঙে পুনরায় কাজ শুরু করা হয়।'
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ডেপুটি রেঞ্জার (রেঞ্জ কর্মকর্তা) আরিফুল ইসলাম বলেন, 'শুরু থেকেই আমরা কাজটি বন্ধ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু প্রায় ২০০ জন লোক নিয়ে কাজ শুরু হওয়ায় সীমিত জনবল নিয়ে বাধা দেওয়া সম্ভব হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন।'
তিনি বলেন, 'বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী- অভয়ারণ্যের আশপাশের মধ্যে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। এমনকি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি হলেও সেখানে শুধু কৃষি কাজ করা যাবে, স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। ২০০৯ সালের একটি প্রজ্ঞাপনেও এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে।'
এদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ও স্থানটি পরিদর্শন করেছে।
অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরেফিন বাদল বলেন, 'এসটিএস নির্মাণের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক হলেও সিটি কর্পোরেশন তা নেয়নি। তাদের প্রতিবেদনে ওই স্থানে এসটিএস নির্মাণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।'
ভাওয়াল গড় বাঁচাও আন্দোলনের মহাসচিব রিপন আনসারী বলেন, 'প্রকাশ্যে আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।'
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল হাসান বলেন, 'যে জমিতে এসটিএস নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটি ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের অংশ নয়। জমিটি ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং সিটি কর্পোরেশন তা ভাড়া নিয়েছে।'
তবে তিনি স্বীকার করেন, জমিটির তিন দিকেই ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সীমানা রয়েছে এবং একদিকে রয়েছে মহাসড়ক।
তিনি বলেন, 'বিদ্যমান আইন অনুযায়ী জাতীয় উদ্যানের সীমানার মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি নেই। তবুও বিকল্প জমি না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে এই উদ্যোগ নিতে হচ্ছে।' এ ক্ষেত্রে বন বিভাগের পক্ষ থেকে আপত্তি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সোহেল হাসান বলেন, 'বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিবের মধ্যে আলোচনা চলছে। দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে শিগগিরই একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া যাবে।'
তিনি বলেন, 'এর আগে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে বর্জ্য ফেলা হতো। নতুন এই ব্যবস্থা চালু হলে সেখানে আর বর্জ্য ফেলতে হবে না।'
আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সোহেল হাসান বলেন, 'বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।'
এনএ/এমএ