যুক্তরাষ্ট্রে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের লাশ ১৮ দিন পর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে।
সোমবার (৪ মে) বিকেল ৩:১২টায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের লাশবাহী গাড়িতে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের মহিষবাতান (লালডোবা) গ্রামের নিজ বাড়িতে পৌঁছে।
এর আগে সকাল ৮:৪৭টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে লাশ রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসা ওবায়েদ এবং লিমনের বাবা-মা বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।
লাশ আসার পর হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্য, বাল্যবন্ধু, স্বজন ও এলাকাবাসী।
নিহত লিমনের বাবা জহুরুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেকে আমি কোনো দিন কষ্ট দেইনি। আমার একটাই দুঃখ, আমার ছেলেকে কেন এত কষ্ট দিয়ে মারা হলো? আমি আমার ছেলেকে কোনো দিন একটা চড়-থাপ্পড়ও দিইনি; শুধু মুখে শাসন করেছি। ছেলে আমাকে নিশ্চিন্তে থাকতে বলত। সে বলত—তোমার কোনো দিন চাকরি-বাকরি কিছুই করতে হবে না।”
ঘটনার সূত্রে জানা যায়, ২৭ বছর বয়সী জামিল আহমেদ লিমন ও বৃষ্টি নামে অপর এক সহপাঠী গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিখোঁজ হন। ২৪ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড সেতুর কাছে লিমনের লাশ উদ্ধার করা হয়। মৃতদেহে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তা খণ্ডিত অবস্থায় পাওয়া যায়।
এর দুই দিন পর, ২৬ এপ্রিল ওই সেতুর কাছাকাছি ম্যানগ্রোভ এলাকায় মাছ শিকার করতে গিয়ে জেলেরা একটি কালো পলিথিন দেখতে পান। পরে পুলিশ সেখানে গিয়ে আরেক নিখোঁজ শিক্ষার্থী বৃষ্টির লাশের খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করে।
এই ঘটনায় লিমনের রুমমেট মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুগারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, লিমনের পৈতৃক নিবাস মাদারগঞ্জের লালডোবা হলেও শৈশব কেটেছে গাজীপুরের মাওনা এলাকায়। শিক্ষাজীবনে লিমন ছিলেন মেধাবী। তিনি মাওনা মডেল হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং বীরশ্রেষ্ঠ আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতিমালা বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন।
দুই ভাইয়ের মধ্যে লিমন বড় ছিলেন। তার ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ বুয়েট থেকে পড়াশোনা করেছেন। লিমনের মৃত্যুতে পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে। ছেলে হারানোর শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন মা লুৎফুন হক।
লিমনের বাবা জহুরুল ইসলাম বলেন, “আমরা হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে কিছুই জানি না। যা জেনেছি, তা মিডিয়ার মাধ্যমেই জেনেছি। আমি চাই আমার দেশের ছাত্ররা কিংবা ভিন্ন দেশের ছাত্ররাও যেন বিদেশে নিরাপদে পড়াশোনা করতে পারে।”
তিনি দুই দেশের সরকারের কাছে বিচার দাবি করে বলেন, “উভয় দেশের সরকার ও তদন্ত সংস্থার কর্মকাণ্ডে আমরা সন্তুষ্ট। আমি চাই, যে পিশাচ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তার সর্বোচ্চ শাস্তি হোক।”
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম আব্দুল্লাহ বিন রশিদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া না দেওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জেজে/আরএন