Monday | 1 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Monday | 1 June 2026 | Epaper
BREAKING: সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে মার্কেট-শপিংমল বন্ধের নির্দেশ      প্রবীণ আ.লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন      পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ      ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গ্রাহক-পুলিশ সংঘর্ষ      ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের      মরণোত্তর জাতিসংঘ পদক পাচ্ছেন ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী      বাজেটের আগে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এক ধরনের ধোঁকাবাজি: জামায়াত আমির      

পাওয়া না পাওয়ার হিসেব কেবল মে দিবসেই

প্রকাশ: শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬, ১১:২২ এএম   (ভিজিট : ১৫২)

সকালটা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। গ্রামের কাঁচা পথগুলো নরম হয়ে আছে তখনও, আকাশে হালকা আলো ফুটছে মাত্র। কিন্তু শেফালীর দিনের কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। ঘুম থেকে উঠে সে প্রথমে চুলায় আগুন জ্বালায়, হাঁড়িতে ভাত বসায়, ছোট ছেলেটার জন্য একটু লবণ-মরিচ দিয়ে ভাত মেখে রাখে। তারপর মাথায় পুরোনো শাড়ির আঁচল শক্ত করে বেঁধে নেয়- কারণ সামনে অপেক্ষা করছে আরেকটি দীর্ঘ দিন। মাঠে যেতে হবে, অন্যের জমিতে কাজ করতে হবে, মাটি কাটতে হবে, ধান রোপণ করতে হবে, কিংবা ফসল তুলতে হবে।

শেফালী একজন দিনমজুর। তার শ্রমের কোনো স্থায়িত্ব নেই, কোনো নিশ্চয়তাও নেই। কাজ পেলে আয়, না পেলে অনাহারে থাকতে হয়। কিন্তু সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো- একই মাঠে, একই কাজ করে, একই সময় ঘাম ঝরিয়েও সে পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে কম মজুরি পায়। যেখানে একজন পুরুষ দিনমজুর ৪০০-৫০০ টাকা পায়, সেখানে শেফালীর হাতে তুলে দেওয়া হয় ২৫০-৩০০ টাকা। কোনো যুক্তি নেই, কোনো ব্যাখ্যাও নেই- এ যেন সমাজের অলিখিত নিয়ম।

দিন শেষে বাড়ি ফিরে তার বিশ্রামের সুযোগ নেই। আবার রান্না, সন্তানদের দেখাশোনা, অসুস্থ শাশুড়ির সেবা- সব মিলিয়ে তার জীবন একটানা শ্রমের নদী, যার কোনো বিরাম নেই। কিন্তু এই শ্রমের বড় অংশই অদৃশ্য, অমূল্যায়িত। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সে হয়তো একবার ভাবে- তার পরিশ্রমের দাম কি সত্যিই এত কম? কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সুযোগ তার নেই। কারণ ভোর হলেই আবার তাকে ছুটতে হবে জীবিকার সন্ধানে।

এই গল্পটি শেফালীর একার নয়। এটি বাংলাদেশের হাজারো গ্রামের, লাখো নারীর প্রতিদিনের বাস্তবতা। 

এই গল্পেরই আরেকটি রূপ দেখা যায় শহরের গার্মেন্টস কারখানায়, যেখানে রাশেদারা প্রতিদিন যন্ত্রের শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের স্বপ্নকে বুনে চলে। গ্রাম থেকে শহর- পরিবেশ বদলায়, কিন্তু নারীর শ্রমের অবমূল্যায়নের গল্প একই থাকে।

মে দিবস এলেই আমরা শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কথা বলি। সভা হয়, সেমিনার হয়, পোস্টার-ফেস্টুনে ভরে ওঠে শহর। কিন্তু শেফালী বা রাশেদার জীবনে এই কথাগুলোর প্রতিফলন কতটা ঘটে? তাদের কাছে মে দিবস শুধু একটি ছুটির দিন নয়; বরং আরেকটি কর্মদিবস, যেখানে শ্রমের মূল্য একই ভাবে কম থেকে যায়।

নারীর মজুরি বৈষম্য কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত অসাম্য, যা বিশ্বজুড়েই বিদ্যমান। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে এর প্রভাব অবর্ননীয়।  

আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো বার বার দেখিয়েছে- একই কর্মঘণ্টা হলেও বিশ্বব্যাপী নারীরা গড়ে পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২০  থেকে ৩০ শতাংশ কম মজুরি পান। তবে এই গড় হিসাব বাস্তবতার সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। কারণ অনেক ক্ষেত্রে নারীরা এমন খাতে কাজ করেন, যেখানে মজুরি নির্ধারণই অনিয়মিত, ফলে প্রকৃত বৈষম্য আরও বেশি।
বাংলাদেশে এই বাস্তবতা আরও জটিল। 

দেশের মোট নারী শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে- যেখানে নেই কোনো লিখিত চুক্তি, নেই নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো, নেই সামাজিক নিরাপত্তা। কৃষি, গৃহশ্রম, ক্ষুদ্র উৎপাদন, এমনকি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা সব চেয়ে বড় ক্ষেত্র গার্মেন্টস শিল্পের নিম্নস্তরেও এই অনিশ্চয়তা বিরাজমান। ফলে নারীরা শুধু কম মজুরি পান না, বরং তাদের শ্রমের কোনো স্থায়ী মূল্যও নির্ধারিত হয় না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, গ্রামীণ অঞ্চলে নারী-পুরুষ মজুরি ব্যবধান এখনও উল্লেখযোগ্য। একই ধরনের কৃষিশ্রমে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে ৩০-৪০ শতাংশ কম আয় করেন। শহরাঞ্চলেও পরিস্থিতি খুব একটা ভিন্ন নয়। গার্মেন্টস খাতে নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ হলেও, উচ্চপদে তাদের উপস্থিতি অত্যন্ত কম। ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নারীর সংখ্যা কম হওয়ায় মজুরি কাঠামোতেও তাদের প্রভাব সীমিত থাকে।
এই বৈষম্যের পেছনে কেবল অর্থনৈতিক কারণ নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাও গভীর ভাবে জড়িত। বহুদিন ধরে সমাজে কিছু কাজকে “নারীর কাজ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে- যেমন গৃহশ্রম, কৃষি সেলাই, পরিচর্যা। এই কাজগুলোকে স্বাভাবিকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ এবং কম মূল্যবান হিসেবে দেখা হয়। ফলে এসব খাতে মজুরি কম থাকে, এবং নারীরা সেই কম মজুরির কাঠামোর মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে পড়েন।

তার সঙ্গে যুক্ত হয় অদৃশ্য শ্রমের বোঝা। একজন নারী কর্মক্ষেত্রে কাজ করার পাশাপাশি ঘরের সব দায়িত্ব পালন করেন। রান্না, সন্তান লালন-পালন, বয়স্কদের যত্ন- এসব কাজের কোনো অর্থনৈতিক মূল্য নেই। অথচ উন্নত দেশগুলোতে সকল শ্রমের মুল্য সমান।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সময় ব্যয় করেন এই অদৃশ্য শ্রমে। কিন্তু জাতীয় আয়ের হিসাব বা উৎপাদনশীলতার পরিমাপে এই শ্রমের কোনো স্বীকৃতি নেই।

মাতৃত্বও নারীর অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে কাজ করে। সন্তান জন্মের পর অনেক নারী কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসতে পারেন না, অথবা কম সময় কাজ করতে বাধ্য হন। এর ফলে তাদের আয় কমে যায়, ক্যারিয়ার অগ্রগতি থেমে যায়। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন সুবিধা দেয় না, কিংবা কর্মক্ষেত্রে শিশু যত্নের ব্যবস্থা রাখে না। ফলে নারীরা একধরনের দ্বৈত চাপের মধ্যে পড়ে- একদিকে কর্মজীবন, অন্যদিকে পারিবারিক দায়িত্ব।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও এই বৈষম্যকে আরও গভীর করে। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের কম দক্ষ বা কম উৎপাদনশীল হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণা নিয়োগ, মজুরি নির্ধারণ, পদোন্নতি- সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে। ফলে নারীরা একই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কম সুযোগ পান।

মে দিবসের ইতিহাস আমাদের শেখায়—শ্রমিকের অধিকার কোনো দয়া নয়, এটি সংগ্রামের ফল। ১৮৮৬ সালের আন্দোলন শ্রমিকদের জন্য কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ন্যায্য মজুরি এবং মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার পথ খুলে দেয়। কিন্তু আজও যখন আমরা দেখি নারীরা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত, তখন প্রশ্ন জাগে- আমরা কি সত্যিই সেই সংগ্রামের চেতনা ধারণ করতে পেরেছি? অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বৈষম্য একটি বড় ক্ষতির কারণ। 

বিশ্ব ব্যাংক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমানো গেলে একটি দেশের জিডিপি উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। নারীদের শ্রমশক্তিতে পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতির গতি আরও ত্বরান্বিত হয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদান বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গার্মেন্টস শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ যোগান দেয়, যেখানে নারী শ্রমিকদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এই খাতের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান এখনও সন্তোষজনক নয়। নিম্ন মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, নিরাপত্তাহীনতা- সব মিলিয়ে তাদের জীবন সংগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

এই বাস্তবতায় পরিবর্তন আনতে হলে কেবল নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা, অনানুষ্ঠানিক খাতকে নিয়মের মধ্যে আনা, নারীদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো, মাতৃত্বকালীন সুবিধা নিশ্চিত করা- এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে কঠোর ভাবে। একইসঙ্গে সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।

কারণ, আইন দিয়ে সবকিছু বদলানো যায় না; মানসিকতা না বদলালে বৈষম্য থেকে যায়। নারীর শ্রমকে সম্মান করার মানসিকতা তৈরি না হলে কোনো উন্নয়নই পূর্ণতা পায় না। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই- যে সমাজে শ্রমের মূল্য যোগ্যতায় নয়, লিঙ্গভেদে নির্ধারিত হয়, সেই সমাজ কি সত্যিই ন্যায় ও মানবিকতার দাবি করতে পারে?

শেফালীরা যখন দিন শেষে অবসন্ন শরীর আর না-পাওয়া স্বপ্নের ভার বুকে নিয়ে ঘরে ফেরে, তাদের চোখের কোণে জমে থাকা নীরব অশ্রু যেন একটি রাষ্ট্র, একটি সমাজ ও বৈষম্যময় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নির্মম ব্যর্থতার সাক্ষ্য হয়ে ওঠে। আর শহরের গার্মেন্টস কারখানায় দাঁড়িয়ে থাকা রাশেদারা যখন মেশিনের নির্দয় শব্দ আর প্রখর তাপের আড়ালে নিজেদের ক্লান্তি, কষ্ট আর দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রাখে, তখন তারা শুধু পোশাক সেলাই করে না- নিজেদের রক্ত ঘাম মিশিয়ে গড়ে তোলে দেশের অর্থনীতি, রপ্তানির সাফল্য আর উন্নয়নের উজ্জ্বল পরিসংখ্যান। অথচ সেই সাফল্যের গল্পে তাদের নিজের জীবনের পাতাগুলোই থেকে যায় সবচেয়ে অবহেলিত। 

মে দিবস সত্যিকারের অর্থ পাবে সে দিনই, যে দিন শেফালীদের চোখের জল আর রাশেদাদের চাপা কান্না আমাদের বিবেককে গভীর ভাবে নাড়া দেবে, আর তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য কেবল স্লোগানে নয়, বাস্তব জীবনেও নিশ্চিত হবে।

কারণ, শ্রমের কোনো লিঙ্গ নেই- কিন্তু ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা আমাদের মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মে দিবস এলেই শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, বঞ্চনা আর না-পাওয়া অধিকারের গল্প নতুন করে আলোচনায় আসে। অথচ বছরের বাকি দিনগুলোতে তাদের কষ্ট যেন নীরব দেয়ালের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে। যে হাত সভ্যতার চাকা ঘোরায়, সেই হাতগুলো  আজও ন্যায্য মজুরি, সম্মান আর নিরাপদ জীবনের জন্য অপেক্ষায় থাকে। তাই মে দিবস শুধু উৎসবের দিন নয়- এটি হওয়া উচিত প্রতিটি শ্রমিকের না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস শোনার এবং তাদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের দিন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সমাজবিজ্ঞান বিভাগ রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেইলি অবজারভার।

এমএ




LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close