বুদ্ধিবৃত্তিক বা বুদ্ধি দ্বারা চালিত প্রাণী, উচ্চবর্গীয় শ্রেণির প্রাণী– মানুষ। পৃথিবীতে আগমনের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল চরম অসহায়— প্রতিকূল প্রকৃতি-পরিবেশের কাছে। অসহায়ের শক্তির উৎস কিংবা আশ্রয় হলো নিজের চেয়ে অধিকতর শক্তিমান কোনো প্রাণী বা বস্তুর প্রতি নিরঙ্কুশ বিশ্বাস স্থাপন। সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতে আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বণের দ্বারা অগাধ ভক্তি-শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটানোকেই মোটা দাগে বলা যায় ধর্ম। পরিবেশ ও জলবায়ুর নিয়মতান্ত্রিক কিংবা স্বাভাবিক পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে ভূগোল। ভূগোলের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হয়েছে ধর্মের অবতার বা ভগবান এবং তার দেব-দেবীর রূপ-রস-গন্ধ।
সর্বপ্রাণবাদ থেকে শুরু করে সর্বশেষ সংস্করণ একেশ্বরবাদ। এখনকার উন্নত আধুনিক কিংবা ভার্চুয়াল প্রযুক্তির যুগে ঈশ্বর বা ভগবান বা সৃষ্টিকর্তার স্থান করে নিয়েছে বিজ্ঞাননির্ভর প্রকৃতি। প্রকৃতির অগণিত বস্তুর অগণিত কক্ষপথের মাত্র সামান্য অংশের নিয়ম আমরা জেনেছি সকলে মিলে। অঞ্জেয়নিয়ম তথা অনাবিষ্কৃত পথের অনুদ্ঘাটিত রহস্য এখনো আমাদেরকে ধরে রেখেছে ধর্মবিশ্বাসের পথে।
ধর্মের অনুশীলনের প্রধান উদ্দেশ্য মুক্তিলাভ। মনও দেহের দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তিলাভ, রোগ-জরা-শোক থেকে মুক্তিলাভ।
ঐশ্বরিক চেতনা তথা অস্তিত্বের সাথে সংযুক্ত হয়ে দেহের খাঁচায় আবদ্ধ আত্মার মুক্তির সন্ধান দেওয়া বা পথ খুঁজে দেওয়া এবং সে পথে হেঁটে গন্তব্য পৌঁছার অনুশীলন করানো ধর্মের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আমাদের ভবিষ্যৎ অজানা। তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় আমরা সমৃদ্ধ। অভিজ্ঞতা বলে, ধর্ম নিজে নিজে শুধু নির্দোষ নয় শুদ্ধতার শিখাও বটে; তবে ধর্মগুরু বা ব্রাহ্মণ- পুরোহিতদের কার্যকলাপ সামগ্রিক বিচারে বলে দেয় ধর্মের নামে অধর্মের প্রচণ্ড দাপটে মুক্তির পথ শুধু বন্ধই হয়নি, হয়েছে বিতর্কিত এবং কণ্টকাকীর্ণ।
মধ্যযুগে ব্রাহ্মণ্যবাদের কিংবা চার্চের একচ্ছত্র শোষণ ব্যাকরণ শিকলে আবদ্ধ করেছে মানবতার আত্মা-মনুষ্যত্বের বিকাশ। শক্তির নগ্ন খেলা দেখেছে শোষিত বঞ্চিত অসহায় মানুষ বহুদিন, বহুযুগ। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মেতেছে বিদ্রোহ-সংগ্রামে, হয়ে উঠেছে ধর্মাদ্রোহী, সয়েছে যত যন্ত্রণা ধর্মাবতারের নামে মানুষরূপী দানবের হাতে। ধর্মের নতুন নতুন সংস্করণের দ্বারা শাসকগোষ্ঠী করেছে আধিপত্য— নিয়ন্ত্রণ বহাল রাখার সুব্যবস্থা। সকল ধর্মের মূলেই ছিল ইহজাগতিক তথা নশ্বর দেহেকে পরজগতে অবিনশ্বর অস্তিত্বে রূপান্তরের মাধ্যমে অনাবিল সুখের ঠিকানায় নিয়ে যাওয়া কিংবা জীবনচক্রের মধ্যে থেকেই নির্বাণ লাভ বা পরম মুক্তি লাভ করা।
ধর্মের অনুশীলনে ব্যাকরণ তথা রিচুয়ালের কেন্দ্রে থাকে বিশ্বাস। কোনো কোনো ধর্মে বিশ্বাসের সাথে যুক্তিকেও মেনে নেয়; তবে মোল্লা-পুরোহিতগণ কোনোভাবেই গ্রহণ করতে চায় না যুক্তির মাধ্যমে বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করার প্রয়াসকে। কারণ তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিংবা বিনাশ হবে তাদের ব্যাবসা। ধর্মব্যবসায়ীরা সবকিছু পারে। বেদআ’ত বা অপাঙ্ক্তেয় প্রযুক্তিকে অনুসারীদের জন্য হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে জায়েজ করে নিতে পারে নিজেদের ব্যবহারের জন্য।
ধর্মব্যবসা যদি পুঁজিবাদের বাজারব্যবস্থার আরাধ্য পূজনীয় কর্ম হতো তাতেও কোনো প্রশ্ন ছিল না; এ বাজারে মানুষ জেনেশুনে স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে অথবা পদ্ধতির জাঁতাকলে পড়ে পণ্যের পূজা করে, পণ্যের দাস হয়; কিন্তু ধর্মের ব্যাবসা বড় বেশি বিচিত্র ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন; প্রতিযোগিতা নেই সেখানে, আছে অন্ধকারের শত শত যুগের একচেটিয়া মূল্যের ধারাবাহিক সংস্করণ।
ধর্মীয় বিশ্বাস বা আচার অনুশীলনের মাধ্যমে যন্ত্রণা থেকে কিংবা কষ্ট থেকে মুক্তি পায় অনেকেই; তবে তা একান্তই ব্যক্তিগত পর্যায়ের অনুশীলন দ্বারা স্রষ্টার সাথে একান্ত নিজস্ব নিবিড় যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে। বাউলের বৈরাগ্য সাধন এর চেয়েও বেশি কার্যকর পথ; যদিও বাউলরা ধর্ম নিয়ে কখনোই বাড়াবাড়ি করে না। মানবমুক্তির ক্ষেত্রে বাউলের ভূমিকা বা কার্যকারিতা অন্য সময় আলোচনা করব।
ধর্মের মূল ভিত্তি শর্তহীন বিশ্বাস, যুক্তির অস্ত্র সেখানে ভোঁতা। অন্তরের আবেগটাই সেখানেই মুখ্য। ধর্মের আকার অবয়ব নির্যাসের পুরোটাই তাই স্পর্শকাতর; ধর্মকে সামষ্টিক জীবনাচারে না রেখে একান্ত ব্যক্তি পর্যায়ে রাখাটাই— ধর্ম ও সমাজ এবং ব্যক্তি সকলের জন্যই নিরাপদ এ পর্যায়ে এটুকু বলা যায়, ধর্ম নিজে শুদ্ধ হলেও যে মানবসমাজ তা প্রয়োগ করে তাদের অপব্যবহারের কারণে ধর্ম মানুষকে মুক্তির পথে নিয়ে যাওয়ার চাইতে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে বেশি। এ শৃঙ্খল ভাঙতে হবে— নামতে হবে সংগ্রামে, মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে; আসবে দ্বন্দ্ব, আসবে সংঘাত, রুখতেই হবে ধর্মীয় মৌলবাদকে— মৌলবাদের বিরুদ্ধে মুক্তির সংগ্রাম চলে আসছে এবং চলবেই নিরন্তর।
মনিরুজ্জামান বাদল
কবি ও প্রাবন্ধিক
(লেখকের ‘মুক্তির সংগ্রাম নিরন্তর’ গ্রন্থ থেকে পুনঃমুদ্রিত)
আরএন