সাত খুন কলঙ্ক লেপে দিয়েছিল নারায়ণগঞ্জকে। সাত জনকেই হত্যা করা হয়েছিল অত্যন্ত নির্মম ভাবে। একই স্টাইলে হত্যা করে পেট ফুটো করে প্রত্যেককে ২৪টি ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া হয় যাতে করে লাশ ভেসে উঠতে না পারে। সেই ভয়াবহ ৭ খুনের এমন পৈশাচিকতার সুষ্ঠু বিচার কার্যকরের অপেক্ষার অবসান হয়নি ১২ বছরেও। নিম্ন আদালত ৯ বছর আগে ও উচ্চ আদালত ৮ বছর আগে রায় ঘোষণা করলেও আপিল বিভাগে ঝুলে রয়েছে আলোচিত ৭ খুন মামলাটি।
জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে গাড়ি আটকে অপহরণ করা হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের তৎকালিন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, নজরুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন এবং মনিরুজ্জামান স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলমকে। তাদেরকে অপহরণের ভিডিও করায় সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিমকেও একইসঙ্গে অপহরণ করা হয়। সাত জনকে অপহরণের প্রতিবাদে সে সময় উত্তাল হয়ে উঠে নারায়ণগঞ্জ। এরপর তাদেরকে শ্বাসরোধে হত্যার পরে লাশ গুমের চেষ্টা করে ঘাতকরা।
৩০ এপ্রিল বন্দরে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর থেকে একে একে ভেসে উঠে তাদের পেট কাটা, ২৪টি ইট বাঁধা মরদেহ। লোমহর্ষক এ সাত খুনের সাথে র্যাবের তিন কর্মকর্তাসহ একাধিক সদস্য ও নাসিকের কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা জড়িত থাকার ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়।
এ ঘটনায় দুটি মামলার বাদি হন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং চন্দন সরকারের মেয়ের জামাতা বিজয় কুমার পাল। ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন, র্যাব-১১ এর তৎকালীন অধিনায়ক তারেক সাঈদ, অপর দুই কর্মকর্তা মেজর আরিফ, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার রানাসহ ২৬ জনের মৃতুদণ্ডাদেশ দেন।
২০১৮ সালের আগস্টে হাইকোর্ট ১৫ আসামির মৃতুদণ্ড বহাল রেখে বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। এ রায়ের পর ১৩ জন আসামি আপীল করলেও তা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এরপর দুই মামলায় মোট এক হাজার ৫৬৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করে হাইকোর্ট।
ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, র্যাব একটি এলিট ফোর্স এবং মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য এরা বহুবিধ কাজ করেছে। কিছু ব্যক্তির জন্য সামগ্রিক ভাবে এই বাহিনীকে দায়ী করা যায় না। আসামিরা যে ধরনের অপরাধ করেছে, যদি তারা ছাড়া পেয়ে যায় তাহলে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণ আস্থাহীনতায় ভুগবে।
সাত খুনের ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত থাকায় মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে সংশয় ছিল। চরম সংবেদনশীল ও আলোচিত এই মামলার শেষ পরিণতি দেখার জন্য গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন দেশবাসী।
তবে দীর্ঘ ৯ বছরেও নিম্ন আদালতের রায় কার্যকর না হওয়ায় হতাশায় ভুগছেন নিহতদের পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসী। তাদের চোখে মুখে এখন একটাই জিজ্ঞাসা- কবে শেষ হবে বিচার?
নিহত তাজুলের বাবা আবুল খায়ের ও ভাই রাজু জানান, একযুগ পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বিচার নিয়ে হতাশায় দিন পার করছেন পরিবার। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সে সময় নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বলেছিলেন বিএনপি আগামীতে ক্ষমতায় আসলে এই ৭ খুন মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিচার করবেন। বর্তমানে তার পুত্র তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। আশা করছি তিনি দ্রুত আপিল বিভাগের বিষয়টি নিস্পত্তি করে রায় কার্যকরের পদক্ষেপ নেবেন।
নিহত গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের স্ত্রী শামসুন্নাহার আক্তার নুপুর বলেন, 'স্বামীকে হারানোর সেই মর্মান্তিক সময়ে আমি অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। স্বামীর নির্মম হত্যার মাত্র এক মাস পর জন্ম নেয় তাদের কন্যা রোজা আক্তার জান্নাত। আজ তার বয়স ১১ বছর- কিন্তু সে জীবনে একবারের জন্যও তার বাবার মুখ দেখতে পারেনি।'
নুপুরের কণ্ঠে এখনো সেই বেদনার ভার- একদিকে স্বামী হারানোর অসহনীয় শোক, অন্যদিকে অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। সেই কঠিন সময় পেরিয়ে তিনি একাই সন্তানের লালন-পালন করছেন, প্রতিটি দিনই তার কাছে একেকটি সংগ্রাম।
ছোট্ট রোজার হৃদয়েও জমে আছে না বলা অনেক কষ্ট। সে জানায়, মাদ্রাসায় যখন তার সহপাঠীদের বাবারা তাদের আনতে বা নিতে আসেন, তখনই তার নিজের বাবার অভাবটা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। অন্যদের বাবার হাত ধরে বাড়ি ফেরা দেখে সে নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে- মনে মনে হয়তো ভাবে, 'আমার বাবাও যদি আজ বেঁচে থাকতেন...'
একটি শিশুর জীবনে বাবার অনুপস্থিতি যে কতটা গভীর শূন্যতা তৈরি করে, রোজা তারই এক জীবন্ত উদাহরণ। এই পরিবার আজও সেই শোক, বেদনা আর অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে বেড়াচ্ছে- শুধু একটি ন্যায় বিচারের আশায়।
নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও মামলার বাদি সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, 'আমাদের মামলার রায় নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত- সব পর্যায়েই হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম, রায়টি খুব দ্রুত কার্যকর হবে। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে আজ ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এর কোনো বাস্তব অগ্রগতি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এতে আমরা চরম অনিশ্চয়তা, ভয় এবং আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।'
'অনেকেই বলেন, আসামিপক্ষ অত্যন্ত শক্তিশালী- তারা হয়তো বের হয়ে আসবে। আমি এই মামলার একজন বাদি হিসেবে প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে থাকি। আমার স্বামীকে নির্মম ভাবে হারিয়েছি, নিজের জীবন নিয়েও ঝুঁকির মধ্যে থেকে ন্যায় বিচারের জন্য লড়াই করে যাচ্ছি। একসময় আমাদের ওপর হত্যার হুমকি ছিল, এমনকি আমাদের পাহারা দিয়েও রাখতে হয়েছে। এত প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ আমরা এই পর্যায়ে এসেছি- শুধু একটি ন্যায় বিচারের আশায়।'
বিউটি বলেন, 'যেভাবে আমাদের স্বজনদের হত্যা করা হয়েছে, তা সত্যিই অকল্পনীয় ও নিষ্ঠুর। এমন নির্মম মৃত্যু আমরা কখনো কল্পনাও করিনি। সারাদেশের মানুষ তখন কেঁদেছে, এখনো সেই কষ্ট ভুলে যায়নি। আমরা যারা স্বামী, বাবা বা ভাই হারিয়েছি- শুধু তারাই এই শোকের গভীরতা বুঝতে পারি। এই যন্ত্রণা বুকে নিয়ে আমরা আমাদের সন্তানদের বড় করছি, সংগ্রাম করে বেঁচে আছি।'
তিনি বলেন, 'আজ আমাদের আর কোনো চাওয়া নেই- শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, যেন আমরা ন্যায় বিচার দেখতে পারি। সেই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের বাসায় এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আশ্বাস দিয়েছিলেন- যদি তাদের দল ক্ষমতায় আসে, তাহলে সর্বপ্রথম এই সাত হত্যার বিচার নিশ্চিত করবেন। তাঁর সেই কথা আজও আমাদের মনে আছে। তিনি আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আমরা এখনো তাঁর দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতির দিকে তাকিয়ে আছি।'
তিনি আরও বলেন, 'বর্তমানে আমরা আশাবাদী, তাঁর ছেলে তারেক রহমানের প্রতি। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি তাঁর মায়ের সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন এবং আমাদের এই সাতটি পরিবারের দুর্ভোগের প্রতি দৃষ্টি দেবেন। আমরা অনুরোধ জানাই- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আইন মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই যেন আমাদের এই মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেন। আমরা শুধু চাই- যারা এত নির্মম ভাবে আমাদের স্বজনদের হত্যা করেছে, তাদের শাস্তি দ্রুত কার্যকর হোক। এটাই আমাদের শেষ আশা।'
বাদিপক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, 'শেখ হাসিনা সরকারের সমালোচনা করে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী মানুষের ন্যায় বিচারে যে অঙ্গিকার করেছে সাত খুনের বিচারও হবে। এ হত্যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। সরকারের ঊর্ধ্বতন এবং অ্যার্টনি জেনারেল আশ্বাস্ত করেছেন মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করার।'
এসএস/এমএ