ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
বিশ্বায়ন ও মুক্তি
✎ মনিরুজ্জামান বাদল
⏲ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:২৫ পিএম
X

আদিতে পৃথিবী ছিল, ভূগোলের বিভাজন ছিল না। মানুষ—জানি না কোনো গ্রহ-নক্ষত্র থেকে নেমে এলো, নাকি ভূমি থেকে জেগে উঠল—সঙ্গে নিয়ে এলো ভূগোলের বিভাজন। প্রথমে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশের কাল্পনিক রেখা, তারপর সত্যি সত্যি হৃদপিণ্ড ফালি ফালি করে বুকে আঁকল জ্যামিতির সৌন্দর্যের রেখা! সেটা সৌন্দর্য, নাকি রক্তক্ষরণ—তা টের পাচ্ছি এখন আমরা সবাই। ভূ-চিত্রাবলির মাকড়সার জালে এখন আমরা আবদ্ধ।

রাজা-মহারাজাদের শৌর্য-বীর্যের আধিপত্যের জালে প্রজা আমরা বন্দি ছিলাম; কোথাও কোথাও এখনো আছি। ভূগোলের বিভাজনকে সত্য মেনে নিজস্ব বলয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এবং মুক্তির সংগ্রামে শামিল হলাম। বহু যুদ্ধ-বিগ্রহের মধ্য দিয়ে, বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর, আমরা কিছুটা থিতু হলাম নিজ নিজ সীমানার জালে। অনন্ত একটুখানি স্বস্তি—মুঠিবদ্ধ করে ধরে রাখার মতো ভূমি তো আছে।

সার্বভৌমত্বের সাধারণ নিয়মে সাময়িক স্বস্তি নিয়ে আমরা চলছি অধিকতর স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কাহীন বেঁচে থাকার পথে। মানুষের সামষ্টিক অস্তিত্বের সুফল হিসেবে পেয়েছি অসীম জ্ঞানভাণ্ডার। উদ্ভাবনের অবারিত প্রান্তর খুলে দিল প্রগতির পথে স্বাচ্ছন্দ্যে চলার হাজার দুয়ার।

বিংশ শতাব্দীর শেষ দশক এবং একবিংশের দুই দশকে আমরা রচনা করলাম বিশ্বায়নের যুগ। তথ্য-প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে বড় নিয়ামক হলেও সমসাময়িক রাজনৈতিক মনন-চিন্তার ভূমিকাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। মন মুক্তি চায়, তাই মুক্তির পথে চলি—ঘাম ঝরাই, উৎসর্গ করি প্রাণ। বুদ্ধিকে প্রয়োগ করি নব নব উপায় আবিষ্কারে, যাতে ছিন্ন করতে পারি সব জাল, ভেঙে ফেলতে পারি বাধার সব দেয়াল।

আমরা—বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের যুগে তৃতীয় বিশ্বের, অতঃপর অনুন্নত/স্বল্পোন্নত/উন্নয়নশীল দেশের মানুষরা—আনুষ্ঠানিক পরিচয়ে নাগরিক কিংবা উদ্বাস্তু, কিংবা পরিচয়-সংকটে আবৃত—কিছুটা হলেও মুক্ত বাণিজ্যের সুযোগ পেলাম, যদিও তা পূর্ণাঙ্গ নয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গত দুই-আড়াই দশকে আমরা এগিয়েছি অনেক দূর। আমাদের জাতীয় আয় বেড়েছে, ভোগ বেড়েছে, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বেড়েছে।

আমরা উজান স্রোতের উষ্ণতার স্বাদ পেয়েছি, যদিও এ স্বাদের সবটুকু আস্বাদনের অধিকার আমাদের ছিল না। পুঁজির চিরায়ত চরিত্রের কেন্দ্রাতিক শক্তির প্রভাব বলয়ে সম্পদ পাচার, মেধা পাচার, এমনকি মূল্যবোধ ক্ষয়ের খপ্পরে পড়ে বৈষম্যের অভিশাপ নিয়েই চলছিলাম। মাঝপথে সে চলাও থেমে গেল—সূচিৎ হলো উল্টো স্রোত।

আধিপত্যবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রবল পরাক্রমে রুখে দাঁড়াল গণমানুষের মুক্তির বিরুদ্ধে। চাতুরী, কপটতা, অপ-রাজনীতির নগ্ন কৌশল প্রয়োগ করতে দ্বিধা করল না। উদ্দেশ্য একটাই—বঞ্চিত মানুষেরা যে শক্তিতে বিশ্ববাণিজ্য ও অর্থনীতির সরবরাহ ধারায় ন্যায্য প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেছে, তা ভেঙে ফেলা এবং পুনরায় ঔপনিবেশিক শোষণের ব্যাকরণ চালু করা।

এই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে যুদ্ধ উসকে দেওয়া হলো; সত্যিই যুদ্ধ বাঁধিয়ে সেই আগুনে তেল ঢালা হলো। অনাকাঙ্ক্ষিত সেই যুদ্ধের কারণে পৃথিবী জ্বলছে, পুড়ছে। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার আকাশে জমেছে ঘন কালো মেঘ। যারা ভুলে গিয়েছিল জঠরজ্বালা, তারা তা আবার ফিরে পেয়েছে। যারা স্বপ্ন দেখছিল শিক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞানে শক্ত ভিত গড়ার—তাদের সেই স্বপ্ন আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত।

যে ধরিত্রী আশা করেছিল নির্যাতন কমবে, সে আজ যুদ্ধের ডামাডোলে, জ্বালানি সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে—দেখছে শুধু মৃত্যুর অন্ধকার ছায়া।

যে বিশ্বায়ন বাড়িয়েছিল বাণিজ্য, বাড়িয়েছিল মানুষের যোগাযোগ, ঘুচিয়ে দিয়েছিল ভূ-গোলের বিভেদ—তার বুকেই আজ ছুরি মেরে আধিপত্যবাদী শক্তি অট্টহাসি হাসছে। একই সঙ্গে জন্ম দিচ্ছে বর্ণবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ, জনস্তুতিবাদ এবং ফ্যাসিবাদের মতো অশুভ শক্তির।

তবুও ইতিহাস প্রগতির ইতিহাস। প্রগতির চাকা সাময়িকভাবে কাদায় আটকে পড়লেও শেষ পর্যন্ত বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে চলে। তাই সংশয় জাগলেও বিশ্বাস করি—প্রগতির চাকা এগিয়েই যাবে বিশ্বায়নের পথে।

আসলেই এখন যা ঘটছে—ভালো বা মন্দ—সবই আমাদেরই সৃষ্টি। অন্য কোনো প্রাণ বা অস্তিত্বের এতে ভূমিকা নেই।

এমন সংকট এর আগেও এসেছে। পূর্বসূরিরা রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে, জীবন উৎসর্গ করে তা মোকাবিলা করেছেন। উত্তরাধিকার হিসেবে আমরা পেয়েছি সেই দায় ও সম্পদ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও তা বহন করবে।

প্রযুক্তি এনে দিচ্ছে হাজারো বিকল্প। কোনটি গ্রহণ করব, কোনটি প্রত্যাখ্যান করব—সিদ্ধান্ত নেবে মানুষের মন। বুদ্ধি উন্নত হলেও মন যদি সাড়া না দেয়, তবে প্রযুক্তির সব অর্জনই ব্যর্থ।

বিশ্বায়নের শুরু থেকে বর্তমান সংকট পর্যন্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, তথ্য-প্রযুক্তি যেমন ভূগোলের বিভাজন ভুলিয়েছে, তেমনি অতীতে মার্কেন্টাইলিজম ও মুক্ত বাণিজ্যও তা করেছিল। তবে সেই মুক্ত বাণিজ্যে আমরা ছিলাম শোষণের শিকার।

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়ন নতুন মাত্রা দিয়েছে। পুঁজির প্রবাহ অবাধ হলেও শ্রমের প্রবাহে বাধা রয়ে গেছে। তবুও আমরা কিছুটা জায়গা করে নিয়েছি। কিন্তু এখানেই শুরু হয় সংকট—যারা দীর্ঘদিন আধিপত্য করেছে, তারা ভীত হয়ে ওঠে।

তারা বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে সুর তোলে, তারপর নানা কৌশলে পরিস্থিতি বদলে দেয়। করোনা মহামারির ধাক্কায় আমরা বিপর্যস্ত হই। ভ্যাকসিনের ব্যয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর যুদ্ধ পরিস্থিতি সংকটকে আরও গভীর করে।

আমরা আবারও জড়িয়ে পড়ি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রভাববলয়ে।

প্রশ্ন ওঠে—এ সংকটে মুক্তির পথ কোথায়?

উত্তর খুঁজতে হবে ইতিহাসে, সংগ্রামের ধারায়। অতীতে সুভাষ বসু, তিতুমীর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতো নেতাদের নেতৃত্বে আমরা পথ খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সংকট আরও জটিল।

একদিকে পশ্চিমা ভোগবাদী রাষ্ট্রগুলোর বাধা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিপতি ও তাদের সহযোগীরা—এই দ্বিমুখী চাপে আমরা বিপর্যস্ত।

তাহলে মুক্তির উপায় কী?

জ্ঞান-বিজ্ঞানেই মুক্তির পথ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে হবে। তবে তা যেন মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হয়—এ নিশ্চয়তা দিতে হবে।

সামষ্টিক কল্যাণ ছাড়া পৃথিবী টিকবে না। গোষ্ঠীকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা দিয়ে মানবসভ্যতা টিকে থাকতে পারে না। তাই স্বার্থান্ধ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্বায়নকে প্রগতির পথে, মুক্তির পথে পরিচালিত করতে হবে। মর্যাদাপূর্ণ বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অব্যাহত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক
লেখকের ‘মুক্তির সংগ্রাম নিরন্তর’ গ্রন্থ থেকে পুনর্মুদ্রিত


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝