লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ও সদর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একসময়ের খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদী এখন পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। দখল ও দূষণে নাব্য হারিয়ে নদীটি রীতিমতো অস্তিত্ব সংকটে। যেন যৌবন হারিয়ে নিঃস্ব। একসময় এই নদীতে পালতোলা নৌকা চলত, পাশাপাশি বড় বড় লঞ্চ ও মালবাহী ট্রলারের নিয়মিত চলাচল ছিল। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা বোরো আবাদে পর্যাপ্ত পানি পেতেন এবং দেশীয় মাছেরও ছিল প্রাচুর্য। ডাকাতিয়া নদী ছিল এ অঞ্চলের বহু মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। বর্তমানে নদীটি শুধুই স্মৃতি।
চাঁদপুর ও পার্শ্ববর্তী লক্ষ্মীপুরের ছয়টি উপজেলা নিয়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটারজুড়ে ডাকাতিয়া নদী ও এর শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত।
নাব্যতা সংকটে বছরের অধিকাংশ সময় নদীটি বালুচরে পরিণত হয়। নিয়মিত খননের অভাবে কৃষকরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। নদীর পানি সেচ কাজে ব্যবহার করতে না পারায় ফসল উৎপাদনে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। অথচ একসময় এই নদী রায়পুর, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুরের কয়েকটি উপজেলার মানুষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ ছিল, যা এখন অভিশাপে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের ১২ জুলাই কচুরিপানায় ভরা রায়পুর পৌর শহরের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রসংলগ্ন ডাকাতিয়া নদীর প্রায় এক কিলোমিটার অংশ ও খালের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেন পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। পোস্ট অফিস সড়কের ওয়াপদা কলোনি থেকে বাঁধের ওপর পর্যন্ত এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পরে আর কোনো নিয়মিত পরিষ্কার কার্যক্রম হয়নি।
সম্প্রতি সরেজমিনে রায়পুর উপজেলা এলাকায় দেখা যায়, ডাকাতিয়া নদীর বুকে কোথাও ফসলের জমি, আবার কোথাও ফেটে চৌচির নদীর তলদেশ। কোথাও কোথাও আবার মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। নদীর দুই পাড়ে প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি নির্মাণ করেছেন। বিভিন্ন স্থানে হোটেল ও কারখানার বর্জ্য ও আবর্জনা ফেলে নদীটিকে দূষিত করে তোলা হয়েছে।
রায়পুরের হাজিমারা থেকে পুরো উপজেলাজুড়ে কচুরিপানার বিস্তার দেখা যায়। পানি দূষণের কারণে মাছ মারা যাচ্ছে এবং মশার উপদ্রবও বেড়েছে। শুধু ডাকাতিয়া নয়, এর শাখা-প্রশাখাগুলোর অবস্থাও একই রকম। একসময় প্রবহমান এই নদীর রূপ-যৌবন এখন প্রায় বিলীন।
বর্তমানে দখল, দূষণ ও ভরাটের কারণে নদীটি মারাত্মকভাবে বিপন্ন। শুষ্ক মৌসুমে এখন আর নদীতে পানি থাকে না; বরং সেচ মৌসুমে এটি বালুচরে পরিণত হয়।
ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও ফেনী অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ডাকাতিয়া নদী। এটি চাঁদপুর ও ফরিদগঞ্জ হয়ে রায়পুরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০৭ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ প্রায় ৬৭ মিটার (প্রায় ২২০ ফুট), যার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর ন্যস্ত। তবে বাস্তবে পুরো নদীতেই সেই প্রস্থ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। দখলের কারণে কোথাও এটি ৩০, কোথাও ৪০ ফুটের সরু খালে পরিণত হয়েছে।
রায়পুরের বামনী ইউনিয়নের বাসিন্দা ডাক্তার মোবারক হোসেন ও সমাজসেবক মো. শহিদ পাটোয়ারী জানান, প্রতিদিনই বাসাবাড়ি, হোটেল ও কারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী দোকানের উচ্ছিষ্টসহ বিভিন্ন বর্জ্য নদীতে ফেলছেন।
রায়পুর পৌরসভার বাসিন্দা ও নদী বাঁচাও আন্দোলনের সংগঠক জিল্লুর রহমান বলেন, “ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে জন্ম নেওয়ায় অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে। একসময় এই অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম ছিল নৌপথ। বড় জাহাজ ও লঞ্চ চলাচল করত, এবং আশপাশের জেলার মানুষ বাণিজ্যের জন্য এখানে আসত। কয়েক হাজার জেলে এই নদীর ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন প্রভাবশালীরা নদী দখল করে নিচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে একসময় ডাকাতিয়া নদীর অস্তিত্বই থাকবে না।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের লক্ষ্মীপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ্জামান খান বলেন, জেলার বিভিন্ন খালসহ রায়পুরের ডাকাতিয়া নদী ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি খাল খননের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই খনন কাজ শুরু হবে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএর সহযোগিতায় অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছার জানান, সরকারের খাল খনন ও পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় খুব শিগগিরই চরবংশী স্টিল ব্রিজসংলগ্ন খালসহ আরও কয়েকটি খাল খনন ও সংস্কার করা হবে। খননের পর এসব খাল নতুন রূপে ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, তার নির্বাচনি এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কাফিলাতলী থেকে হামছাদি পর্যন্ত একটি খালের খনন কাজ শুরু হয়েছে। আরও কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরে সুশীল সমাজের সঙ্গে মতবিনিময়সভায় লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকার গঠনের পর থেকেই এ কার্যক্রমের দৃশ্যমান অগ্রগতি শুরু হয়েছে এবং ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
ওআর/আরএন