দেশে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে এবং এই আন্দোলনকে তিলে তিলে সফলতার দিকে নিয়ে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট (আইইডিবি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার: সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে ১১ দলীয় ঐক্য।
সরকারের দ্বৈত নীতির সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, একসময় গণভোট হারাম, আবার অন্য সময় অর্ধেক হালাল—আমরা এটি পার্লামেন্টে বলেছি। আপনারা দেখেছেন, আমাদের কণ্ঠ দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে; আমরাও সমানতালে তা মোকাবিলা করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, সুযোগ পাই বা না পাই, আমরা কণ্ঠ বন্ধ করিনি। কারণ জনগণ আমাদের তাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলার জন্যই সেখানে পাঠিয়েছে—মুখ বন্ধ করে বসে থাকার জন্য নয়, বরং তাদের অধিকার আদায়ের দাবি জানানোর জন্য।
তিনি বলেন, আমরা সংসদে যাওয়ার আগেই বলেছি, এই সংসদের বিভিন্ন সুবিধা নেওয়ার জন্য আমরা এখানে যাচ্ছি না। অনেক সুবিধা আছে, যা আমরা স্বেচ্ছায় নেব না। যেগুলো না নিলেই নয়, কেবল সেগুলোই নেব। অবৈধ কোনো দিকে আমাদের চোখ বা হাত যাবে না।
জামায়াতের আমির বলেন, এই গণঅভ্যুত্থান কেবল শিক্ষিত ছাত্র বা রাজনীতিবিদদের আন্দোলন নয়। প্রায় ১,৪০০ শহীদের মধ্যে ১,২০০ শহীদের বাড়িতে আমার ব্যক্তিগতভাবে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এই শহীদদের ৬২ শতাংশই শ্রমিক। তারা কি কোটার বৈষম্যের বিরুদ্ধে নেমেছিল? কোটার বৈষম্যের বিরুদ্ধে নেমেছিল আমাদের যুবসমাজ ও ছাত্রসমাজ। শ্রমিকরা নেমেছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে; তারা নেমেছিল একটি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।
তিনি সংসদের বর্তমান অবস্থাকে ‘জুলাই প্রোডাক্ট’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, জুলাই না থাকলে আমরাও নেই। জুলাই আছে বলেই আমরা আছি; জুলাই আছে বলেই সরকার ও বিরোধীদল আছে। এই জুলাইয়ের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সরকার পার পাবে না, ইনশাআল্লাহ। গণভোটের রায়ের মাধ্যমে এই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হবে। এর জন্য প্রয়োজন হলে আবারও জীবন দেব।
তিনি আরও বলেন, গতকাল এই স্থানে জুলাই শহীদ পরিবার এবং যোদ্ধাদের সঙ্গে আমাদের একটি বৈঠক ছিল। সেখানে আমার প্রিয় সহকর্মী ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেছেন, আগামীর আন্দোলনে আমাদের সামনে পাবেন। আমিও কথা দিচ্ছি, আমাদের সামনেই পাবেন, ইনশাআল্লাহ। যতদিন জাতির অধিকারের পক্ষে লড়াই করা প্রয়োজন, ততদিনই সংসদে থাকব; তার বাইরে এক সেকেন্ডও নয়।
ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে বলেন, এই আন্দোলন কোনো সুবিধাবাদী আন্দোলন নয়, ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারাও নয়। এই আন্দোলন ৭০ শতাংশ মানুষের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে শহীদদের রক্তের ওয়াদা এবং জুলাই যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্য।
তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশবাসী আপনারা শুধু পাশে থাকবেন। এই আন্দোলন আমার, আপনাদের—সবার জন্য। আমরা আমাদের সন্তানদের কারো গোলাম বানাতে চাই না। কারো পারিবারিক রাজতন্ত্র বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ হিসেবে চলবে—তা আমরা বরদাস্ত করব না।
রাজনীতির দুষ্টচক্র ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদের এক-তৃতীয়াংশ সময় একজনের বদলে আরেকজনের প্রশংসায় ব্যয় হোক—এটি আর দেখতে বা শুনতে চাই না। প্রশংসা হবে জনগণের। সংসদের ভেতর কথা হবে জনগণের সমস্যা নিয়ে এবং সেখানেই খোলামেলা সমাধান বের হতে হবে। এগুলো বাদ দিয়ে অন্য কিছুর চর্চা আমরা সংসদের ভেতর চাই না।
তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, আমরা ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া এখন সংসদে দেখতে পাচ্ছি। ওই সংসদে দাঁড়িয়ে অতীতে যেভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলা হতো, আজ দু-একজন আমাদের লক্ষ্য করে সেই একই ভঙ্গিতে কথা বলা শুরু করেছেন। আমরা তাদের বলি, জিহ্বা সংযত করুন। এই মনোভাব ও আচরণ দেখাবেন না। জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে প্রজন্ম ও দেশ গড়ে উঠেছে, সেই দেশ কারো রক্তচক্ষু পরোয়া করে না।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপি চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম প্রমুখ।
আরএন