বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার প্রাণকেন্দ্র রায়েন্দা খালটির দক্ষিণ পাড় যেন প্লাস্টিক, পলিথিন ও বর্জ্যের পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বাসাবাড়ির প্লাস্টিক বর্জ্য খালের পারের প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না থাকা এবং প্রশাসনিক উদ্যোগের অভাবে একসময়ের খরস্রোতা খালটি এখন প্রায় মৃত খালে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে, প্লাস্টিক, পলিথিন ও বর্জ্য জোয়ার-ভাটার পানিতে সুন্দরবন এবং বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হচ্ছে।
জেলে ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য জোয়ার-ভাটার টানে পানিতে ভেসে চলে যাচ্ছে। ভাটির টানে নেমে অপচনশীল এসব বর্জ্য বলেশ্বর নদ হয়ে নিকটবর্তী সুন্দরবনেও পৌঁছাচ্ছে। বলেশ্বর নদে জেলেদের জালে আটকা পড়ছে প্লাস্টিকের বোতল ও পলিথিন। সুন্দরবনের বিভিন্ন নদ-নদী ও খালের চরে গাছের শ্বাসমূলেও আটকে থাকতে দেখা যায় এসব বর্জ্য।
বঙ্গোপসাগরের নানা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ এবং সুন্দরবনের মধু ও মাছের জন্য প্রসিদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বাণিজ্যিক বন্দর রায়েন্দা বাজার। এ বাজারের বুক চিরে বয়ে গেছে বলেশ্বর নদের শাখা রায়েন্দা খাল। উপজেলার উন্নয়ন, উৎপাদন এবং মানুষের জীবন-জীবিকার বেশির ভাগই এই খালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। অথচ অবহেলায় এখন এটি মরার পথে।
খালটির উত্তর পারে সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। সাগর থেকে মাছ ধরে শত শত ট্রলার বোঝাই করে ঘাটে আসেন জেলেরা। এ ছাড়া, বলেশ্বর নদের মিঠা পানি জোয়ারের টানে খালের শাখাগুলোতে প্রবাহিত হয়। এই পানি থেকেই কৃষকরা আমন, বোরোসহ সব ধরনের ফসল উৎপাদন করেন। কিন্তু মানবসৃষ্ট বর্জ্যের কারণে খালটি নাব্যতা হারিয়েছে, যা চাষাবাদের জন্য ক্ষতিকর।
ব্যবসায়ীরা জানান, নৌযানে করে ঢাকা ও খুলনা থেকে তাদের বেশির ভাগ ব্যবসায়িক পণ্য আনা-নেওয়া হয়। ময়লা-আবর্জ্যে খালটি ভরাট হওয়ায় তারা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
রায়েন্দা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান বাবুল তালুকদার বলেন, একসময় বাজারের আশপাশে অসংখ্য পরিত্যক্ত ডোবা-নালা ছিল। সেখানে ময়লা ফেলা হতো; কিন্তু এসব ডোবা-নালা ভরাট করে বাড়িঘর তৈরি হওয়ায় এখন আর ময়লা ফেলার স্থান নেই। তাই বিচ্ছিন্নভাবে ময়লা ফেলা হচ্ছে। এসব ময়লা পুড়িয়ে ধ্বংস করা হবে। এ ছাড়া, শিগগিরই পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থান নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষের ব্যবহৃত প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। প্রতিদিন বাজার ও বাসাবাড়ি থেকে আসা এসব অপচনশীল বর্জ্য নদ-নদী হয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করছে। এতে মাছ, বনজ প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক পরিবেশের ভারসাম্য ধ্বংসের মুখে পড়ছে। আমরা চাই প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাজার কমিটি সমন্বিতভাবে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করুক। সুন্দরবন জাতীয় সম্পদ, তাই রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন পঞ্চায়েত বলেন, যত্রতত্র প্লাস্টিক, পলিথিন ও বর্জ্য ফেলার বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি উপজেলা আইন শৃঙ্খলা মিটিং-এ উত্থাপন করেছি। দ্রুত রায়েন্দা বাজারের বিভিন্ন স্থানে ডাস্টবিন স্থাপন করা হবে।
শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহিদ হোসেন বলেন, রায়েন্দা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাথে আলোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমআর/আরএন