সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পান্ডারখাল ফসলরক্ষা বাঁধ এখন অবৈধ বালু, পাথর ও ইটের ব্যবসার দখলে। একসময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ফসল রক্ষা এবং মানুষের অবসর বিনোদনের অন্যতম স্থান হিসেবে পরিচিত এই বাঁধ বর্তমানে বালু-পাথরের স্তূপ, ইট-পাথর ভাঙার ক্রাশার মেশিন এবং ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচলে পরিবেশগত ও কাঠামোগতভাবে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী মহল প্রশাসনের চোখের সামনে বাঁধের দুই পাশে অবৈধভাবে বালু, পাথর ও ইট মজুদ করে ব্যবসা চালিয়ে আসছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকির মুখে পড়েছে প্রায় ৫৩ বছর আগে নির্মিত ফসলরক্ষা বাঁধটি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে পান্ডারগাঁও ইউনিয়নের দেখার হাওরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের ফসল রক্ষায় মান্নারগাঁও ইউনিয়নের শ্যামলবাজার এলাকায় পান্ডারখাল বাঁধ নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে বাঁধের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হলে এটি উপজেলার অন্যতম আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়। একই সঙ্গে বাঁধের ওপর দিয়েই নির্মিত হয় ছাতক-সুনামগঞ্জ সড়ক, যা প্রতিদিন হাজারো মানুষের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ।
কিন্তু গত কয়েক বছরে বাঁধের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অবৈধ বালু ও পাথরের ডিপো। কোথাও কোথাও বসানো হয়েছে ইট-পাথর ভাঙার ক্রাশার মেশিন। ফলে গাছের গোড়ায় স্তূপ করে রাখা বালু-পাথরের কারণে শত শত গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। ভারী ট্রলি ও ট্রাকের অবাধ চলাচলে বাঁধের মাটি সরে গিয়ে ধসের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, শ্যামলবাজারসংলগ্ন পান্ডারখাল বাঁধের বিস্তীর্ণ এলাকা বালু, পাথর ও ইটের স্তূপে দখল হয়ে আছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত বসার ছাউনি ও বিশ্রাম বেঞ্চগুলোর অনেকগুলোই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ছাতক-সুনামগঞ্জ সড়কের দুই পাশে অবৈধভাবে ইট, বালু ও পাথর রাখার কারণে পথচারী, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী এবং যানবাহন চালকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ট্রাক থেকে উড়ে আসা বালু বাতাসের সঙ্গে মানুষের চোখ-মুখে প্রবেশ করায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের বর্তমান ইউপি সদস্য জিয়াউল ইসলাম এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালনার মূল কারিগর। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় প্রবীণ মুরুব্বি সাইদুল হক বলেন, “আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষার জন্য এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন প্রভাবশালীদের অবৈধ দখল ও ব্যবসার কারণে বাঁধটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দ্রুত এটি দখলমুক্ত করা প্রয়োজন।”
স্থানীয় বাসিন্দা সুরুজ্জামান বলেন, “প্রতিদিন অসংখ্য মালবাহী ট্রলি বাঁধের ওপর দিয়ে চলাচল করে। এতে বাঁধের মাটি ক্ষয়ে যাচ্ছে, গাছ মারা যাচ্ছে এবং পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে।”
পথচারী ফারুক মিয়া বলেন, “এই বাঁধ শুধু একটি সড়ক নয়, এটি এলাকার কৃষি, জননিরাপত্তা ও মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু বর্তমানে এটি বালু-পাথরের ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি না থাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না।”
স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী মাহবুব রানা বলেন, “আগে বন্ধুদের নিয়ে এখানে ঘুরতে আসতাম। এখন চারদিকে শুধু বালু-পাথর আর ক্রাশার মেশিন। বাঁধের সৌন্দর্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।”
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বাঁধসংলগ্ন এলাকায় রাতে জুয়ার আসরসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডও সংঘটিত হয়। পাশাপাশি গাছ কেটে ফেলার কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জুয়েল আহমদ বলেন, “বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার উপজেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হলেও কিছুদিন পর আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে। তাই স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।”
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের ধারাবাহিক ও কঠোর উদ্যোগের অভাবে অবৈধ দখল ও ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না। তারা দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনা, অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পান্ডারখাল বাঁধের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। খুব শিগগিরই সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বাঁধটি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
এমবি/আরএন