ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
ই-হেলথ কার্ড: ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ
✎ সিরাজুল ইসলাম
⏲ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:০৬ পিএম
X

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত বহুদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জনসংখ্যার চাপ, চিকিৎসা ব্যয়ের বৃদ্ধি, গ্রাম ও শহরের মধ্যে চিকিৎসাসেবার বৈষম্য—এসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে দেশের সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়িয়ে এসেছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—স্বাস্থ্যসেবাকে ডিজিটাল ও সহজলভ্য করতে ই-হেলথ কার্ড চালু করা হবে।

সরকার গঠনের পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটতে পারে।

ই-হেলথ কার্ড মূলত একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র। এই কার্ডের মাধ্যমে একজন নাগরিকের চিকিৎসা ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট, রোগের তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শ—সবকিছু একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে দেশের যে কোনো হাসপাতালে গেলে রোগীর পুরোনো চিকিৎসার তথ্য সহজেই পাওয়া যাবে। অনেক সময় দেখা যায় রোগী এক হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করেন, পরে অন্য হাসপাতালে যেতে হয়। কিন্তু আগের চিকিৎসার তথ্য না থাকায় নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। এতে সময় ও অর্থ—উভয়ই—নষ্ট হয়। ই-হেলথ কার্ড চালু হলে এই সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো তথ্যের অভাব। রোগীর পূর্ণ চিকিৎসা ইতিহাস অনেক সময় চিকিৎসকের কাছে থাকে না। ফলে চিকিৎসা সিদ্ধান্তে জটিলতা তৈরি হয়। ই-হেলথ কার্ড চালু হলে এই সমস্যা কমবে। একজন চিকিৎসক রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসা, ওষুধের ইতিহাস, অ্যালার্জি বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের তথ্য সহজেই জানতে পারবেন। এতে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া সহজ হবে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা কিডনি রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুখে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনও গ্রামে বসবাস করেন। কিন্তু উন্নত চিকিৎসা সুবিধা বেশি রয়েছে বড় শহরগুলোতে। ফলে গ্রাম থেকে শহরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। ই-হেলথ কার্ড থাকলে গ্রামাঞ্চলের রোগী যখন জেলা বা রাজধানীর হাসপাতালে যাবেন, তখন তার চিকিৎসা ইতিহাস সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে না। হাসপাতালের চিকিৎসক সহজেই সেই তথ্য দেখতে পারবেন। এতে চিকিৎসা প্রক্রিয়া দ্রুত হবে এবং ভুল চিকিৎসার ঝুঁকিও কমবে।

বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। অনেক সময় একই রোগের জন্য বারবার পরীক্ষা করতে হয়। ই-হেলথ কার্ড থাকলে পূর্বের পরীক্ষার তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। চিকিৎসক প্রয়োজন হলে সেই তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন। এতে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কমবে এবং রোগীর খরচও কমতে পারে। এটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ গত এক দশকে ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে খানিকটা অগ্রগতি লাভ করেছে। সরকারি বিভিন্ন সেবা এখন অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। ই-হেলথ কার্ড সেই ডিজিটাল অগ্রযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে। এটি স্বাস্থ্যসেবাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক করে তুলবে। বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যেই এই ধরনের ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালু করেছে এবং সেগুলো বেশ সফল হয়েছে।

তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, দেশের সব হাসপাতাল ও ক্লিনিককে একটি সমন্বিত ডিজিটাল নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে হবে। এর জন্য শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য তথ্যের নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্য যাতে অপব্যবহার না হয়, তার জন্য কঠোর সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এই নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হবে।

নির্বাচনের সময় অনেক প্রতিশ্রুতিই দেওয়া হয়, কিন্তু সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয় না। সেই দিক থেকে ই-হেলথ কার্ড বাস্তবায়নের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। কারণ এটি শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বরং একটি কাঠামোগত সংস্কারের অংশ। স্বাস্থ্যখাতকে আধুনিক ও দক্ষ করতে হলে এমন উদ্যোগ প্রয়োজন। জুনের শেষ নাগাদ এই সেবা চালু করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে যদি এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ই-হেলথ কার্ড শুধু স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করবে না, এর অর্থনৈতিক প্রভাবও থাকতে পারে। যদি চিকিৎসা ব্যয় কমে এবং সেবা দ্রুত পাওয়া যায়, তাহলে মানুষের কর্মক্ষমতা বাড়বে। মানুষের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি মানেই আয়-রোজগার বেড়ে যাওয়া, যা চূড়ান্তভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, সেটিও কিছুটা কমতে পারে। এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সরকার ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণেও সুবিধা পাবে। কোন অঞ্চলে কোন রোগ বেশি হচ্ছে—এসব তথ্য থেকে পরিকল্পনা করা সহজ হবে।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বচ্ছতা। ই-হেলথ কার্ড চালু হলে হাসপাতালের সেবার রেকর্ড ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে। এতে চিকিৎসা সেবার মান মূল্যায়ন করা সহজ হবে এবং দুর্নীতি বা অনিয়ম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল রেকর্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এসব প্রযুক্তি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। ই-হেলথ কার্ড সেই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবা একটি দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার বাস্তবায়নের জন্য শুধু হাসপাতাল বা ডাক্তার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি। ই-হেলথ কার্ড সেই আধুনিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং স্বচ্ছ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি সফল হলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে সত্যিই একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবতার পথে এই উদ্যোগ কতটা সফল হয়—সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে সম্ভাবনার দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুন এক যুগে প্রবেশ করাতে পারে।

(লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

আরএন


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝