“জেলে থাকতি দুবেলা খাওন পাইতাম, এখন অনেক সময় না খাইয়া থাকতি হয়। বৌ ঘর ছাড়ছে, মাইয়েটা একপ্রকার পথের ভিখারি। জেল থেকে মুক্তি পাইছি, কিন্তু জীবন পাই নাই।”
২১ বছর কারাভোগ শেষে ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ইব্রাহিম আলী শেখ (সাগর) এখন এমন বাস্তবতার মুখোমুখি। অথচ তিনি খালাস পেয়েছিলেন তারও আট বছর আগে, ২০১৭ সালে। সেই রায়ের কপি কারাগারে না পৌঁছানোয় তাকে আরও আট বছর ফাঁসির সেলের অন্ধকারে বন্দী থাকতে হয়।
খালাসের পর অতিরিক্ত আট বছর কারাভোগ শেষে মুক্তি পেলেও এক বছর পেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি ইব্রাহিম। বর্তমানে তিনি বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার লখপুর ইউনিয়নের ভবনা-খড়িবুনিয়া গ্রামে মরা পশুর নদীর চরের খাস জমিতে ভগ্নিপতির পরিবারের সঙ্গে আশ্রিত। নিজেদের কোনো জমি নেই। ভগ্নিপতির পরিবারও দরিদ্র। অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন কাটছে তার।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে উপজেলার মরা পশুর নদীর চরের খাস জমিতে থাকা ইব্রাহিমের ভগ্নিপতির বাড়ি গিয়ে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
২০০৩ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন ইব্রাহিম। একই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়। আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় নিজের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেননি। ফলে একে একে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়। পরে কারাগারে থাকা এক কয়েদির পরিবারের সহযোগিতায় উচ্চ আদালতে আপিল করেন। এতে ২০১৭ সালে হত্যা ও যাবজ্জীবনের মামলায় খালাস পান তিনি। অন্য দুই মামলার সাজা ইতোমধ্যে কারাভোগ করে শেষ করেন। কিন্তু খালাসের সেই আদেশ দীর্ঘ আট বছর পর কারাগারে পৌঁছায়।
পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী তদবির ও কারা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে অবশেষে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পান তিনি। কিন্তু সেই মুক্তি তার জীবনে স্বস্তি আনেনি। জেল থেকে বের হয়ে দেখেন নিজের সংসার নেই। গ্রেপ্তারের সময় তার সন্তানের বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। দীর্ঘ কারাবাসে সেই সন্তান বড় হয়ে বিয়েও করেছে। স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছেন অনেক আগেই। ‘খুনের আসামি’ পরিচয়ে সামাজিকভাবে মেয়ের বিয়েতেও বাধা এসেছে বলে জানান তিনি।
শৈশবেই বাবার দ্বিতীয় বিয়ের পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল ইব্রাহিমকে। দিনে রিকশা চালানো ও রাতে বাজারে নাইটগার্ডের কাজ করে মা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও শিশুসন্তানের ভরণপোষণ করতেন।
ইব্রাহিম বলেন, “আমি মিথ্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে জেলে ছিলাম। আমার স্ত্রী আমাকে আর আমার ছোট মেয়েকে ফেলে গেছে। আমার দরিদ্র মা মেয়েটাকে মানুষ করেছে। বড় হওয়ার পর ভালো কোনো পরিবার বিয়ের জন্য এগিয়ে আসেনি। সবাই বলত, বাপ খুনি, মা চলে গেছে।”
তিনি আরও জানান, জেলে বসেই শুনেছিলেন, বাধ্য হয়ে তার মা মেয়েকে একটি অতি দরিদ্র পরিবারে বিয়ে দিয়েছেন। মুক্তির পর এসে দেখেন, মেয়েও অতিকষ্টে দিন কাটাচ্ছে। ইব্রাহিম আক্ষেপ করে বলেন, “জেলে জীবন শেষ করা একজন অক্ষম বাবা হয়ে মেয়ের এই কষ্ট দেখা- এটা মৃত্যুর চেয়েও ভারী। কাজ করার শক্তি নাই, অন্যের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে আছি। নিজেকে জীবন্ত লাশ মনে হয়।”
দীর্ঘ ২১ বছর কনডেম সেলের অন্ধকারে থাকার প্রভাব পড়েছে তার শরীরে। আলো সহ্য করতে পারেন না, চোখে কম দেখেন। বয়সের তুলনায় শরীরে আগেভাগেই বার্ধক্য নেমে এসেছে। হাত-পা অনেকটা অসাড় হয়ে গেছে। ভারী কাজ তো দূরের কথা, সাধারণ কাজও করতে পারেন না। “মানুষ কাজ দিতেও চায় না,”—বললেন তিনি।
নিয়মিত কোনো আয়ের উৎস না থাকায় অনেক সময় বৃদ্ধ মাকে নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হয় তার। ফকিরহাটের মরা পশুর নদীর খাস জমির একটি ঝুপড়ি ঘরে দরিদ্র ভগ্নিপতির পরিবারের পক্ষেও দীর্ঘদিন তাকে বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে।
নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ইব্রাহিম বলেন, “গরিব আছিলাম, তাই নিজেরে বাঁচাইতে পারি নাই। মিথ্যা মামলায় ২১ বছর জেল খাটলাম। তার মধ্যে খালাস পাওয়ার পরও আটটা বছর ফাও জেলে থাকলাম। এখন সরকারের কাছে চাই—আমারে বাঁচার একটা ব্যবস্থা করে দিক।”
খালাস পাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় কারাগারে বন্দী থাকার এই ঘটনা নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা তৈরি হলেও এখনো তার পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণ বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। ইব্রাহিমের স্বজন ও সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত তাকে পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।
ইব্রাহিমের বৃদ্ধ মা কোহিনূর বেগম জানান, ছেলেকে ২১ বছর পর বুকে পেয়েছেন। তাকে ছাড়াতে ইটভাটায় ও অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন। শেষ পর্যন্ত বটিয়াঘাটায় নিজের ঘরটুকু বিক্রি করেছেন। এখন জামাইবাড়িতে ছেলেকে নিয়ে থাকছেন। কিন্তু ছেলের এখন কাজ করে খাওয়ার ক্ষমতা নেই।
এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সন্তোষ কুমার নাথ বলেন, “আমরা ইব্রাহিম আলী শেখের চাহিদা ও সক্ষমতা অনুযায়ী কাজের ব্যবস্থা করব। ফকিরহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে তার কাছে পাঠিয়ে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
এএটি/ এসআর