নওগাঁয় হাম-রুবেলা সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। জেলা থেকে মোট ৩৮টি নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টির ফলাফল পাওয়া গেছে, যেখানে পাঁচজন হাম এবং একজন রুবেলায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। বাকি আটটি নমুনা এখনো পরীক্ষাধীন রয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৯ মার্চ পর্যন্ত জেলায় মোট ৩৮ জন সন্দেহভাজন হাম-রুবেলা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ছয়জন শিশুর শরীরে রোগটি নিশ্চিত হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের বয়স ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে। তারা নওগাঁ সদর, পোরশা, নিয়ামতপুর, সাপাহার, আত্রাই ও মান্দা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। এছাড়া নওগাঁ শহরের বাঙ্গাবাড়িয়া এলাকায় আরও এক শিশুকে সন্দেহভাজন হিসেবে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হাম রোগের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। মূলত উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। জ্বর নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি ও ভিটামিন ‘এ’ প্রদান গুরুত্বপূর্ণ। জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়া সত্ত্বেও অনেক সরকারি হাসপাতালে আক্রান্তদের জন্য পর্যাপ্ত আইসোলেশন ব্যবস্থা নেই। এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিভাবকদের অনেকেই এ বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও প্রকাশ্যে কথা বলতে অনিচ্ছুক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্বজন জানান, হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকলেও ভবিষ্যতে চিকিৎসা পেতে সমস্যার আশঙ্কায় তারা খোলাখুলি মন্তব্য করতে চান না।
নওগাঁ শহরের বাঙ্গাবাড়িয়া এলাকার এক অভিভাবক বলেন, “শিশুর জ্বর ও র্যাশ নিয়ে হাসপাতালে গেলে শুরুতে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পরে অবস্থার অবনতি হলে ভর্তি নেওয়া হয়। আলাদা করে রাখার ব্যবস্থাও তেমন নেই, এতে সংক্রমণ ছড়ানোর ভয় থাকে।”
পোরশা উপজেলার এক আক্রান্ত শিশুর স্বজন অভিযোগ করে বলেন, “উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে রাজশাহী বা অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে, এতে সময় নষ্ট হচ্ছে।”
নওগাঁ সদর হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফরিদ হোসেন বলেন, “হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায় না বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।”
তিনি জানান, প্রথমে জ্বর, চোখ লাল হওয়া ও নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরে শরীরে লালচে র্যাশ ওঠে, যা হাম রোগের প্রধান লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কের সংক্রমণের মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারহানা তন্দ্রা বলেন, “শিশুর জ্বর ও র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে।”
নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম জানান, আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য জেলা সদর হাসপাতালসহ প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বর্তমানে ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে একটি শিশু সন্দেহভাজন রোগী হিসেবে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
তিনি আরও জানান, নওগাঁ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড ও নিয়ামতপুর উপজেলার ভাবিচা ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় আক্রান্তদের আশপাশের প্রায় ৪০টি বাড়ির শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো হচ্ছে এবং অন্যান্য উপজেলাগুলোতে বিশেষ নজরদারি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
আগামী মে মাসে সারাদেশে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিশুদের এমআর টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার, আইসিইউ সুবিধা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সংক্রমণ আরও বিস্তার লাভ করতে পারে।
কেকেএইচ/ এসআর