ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিকে ঘিরে দেশের অন্যতম পর্যটনসমৃদ্ধ জেলা মৌলভীবাজারে নেমেছে পর্যটকদের ঢল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সবুজ চা-বাগান আর পাহাড়-ঝরনার টানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে এসেছেন হাজারো ভ্রমণপিপাসু মানুষ। এতে জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলো হয়ে উঠেছে উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন পর্যটন স্পট ঘুরে দেখা যায় সব বয়সী মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, শ্রীমঙ্গলের বধ্যভূমি ৭১, চা গবেষণা কেন্দ্রসহ প্রায় প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে ছিল উপচে পড়া ভিড়।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশসহ প্রশাসনের সার্বিক তৎপরতা থাকায় স্বস্তি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দর্শনার্থীরা। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পর্যটন এলাকাগুলো যেন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
জেলার পর্যটন শিল্পেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পাঁচতারকা মানের রিসোর্ট থেকে শুরু করে ছোট-বড় হোটেল, কটেজ ও ইকো ভিলেজ—সবখানেই পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম দেখা গেছে। অধিকাংশ আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টে শতভাগ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, ঈদের এই ছুটিতে শত কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের ছুটির প্রথম কয়েক দিনেই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত থেকে সরকারের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় হয়েছে। শুধু লাউয়াছড়াতেই প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পর্যটকের আগমনে রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রীমঙ্গলের বধ্যভূমি ৭১, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা, নীলকণ্ঠের সাত রঙের চা, বাইক্কা বিল, চা-কন্যার ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল উল্লেখযোগ্য। একইসঙ্গে কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া ও মাধবপুর লেক, বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর, কুলাউড়ার পৃথিমপাশা নবাববাড়ি এবং শহরের বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রেও পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
তবে পর্যটকের অতিরিক্ত চাপের কারণে সৃষ্টি হয়েছে যানজটও। শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কের রেলগেট এলাকা থেকে গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্ট পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় দীর্ঘ যানজট দেখা গেছে। অনেক পর্যটক যানবাহন থেকে নেমে হেঁটেই গন্তব্যে পৌঁছেছেন।
ঢাকা থেকে আসা এক পর্যটক মানুন আহমদ জানান, ‘দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার পর বাধ্য হয়ে পরিবারসহ হেঁটে বধ্যভূমি এলাকায় যান। তবে ভোগান্তি থাকলেও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগে কোনো কমতি ছিল না।’
মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতেও একই চিত্র। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। জলপ্রপাতের পানিতে সাঁতার, ছবি তোলা, জলখেলা—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও খুশি পর্যটকদের ভিড়ে জমজমাট বেচাকেনায়।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘রমজানের আগে কিছুটা স্থবির থাকলেও ঈদের ছুটি শুরু হতেই প্রাণ ফিরে পেয়েছে পর্যটন খাত। আরও কিছু দিন পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশাবাদী।’
ঈদকালীন পর্যটক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সহ-ব্যবস্থাপনা নির্বাহী কমিটির সদস্য ফিলা পতমী বলেন, ‘অন্যান্য সময়ের তুলনায় এবারের ঈদে পর্যটকের উপস্থিতি অনেক বেশি ছিল। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বনের পরিবেশ রক্ষায় সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি, বন বিভাগ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়।’
লাউয়াছড়া টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা শাহিন আহমদ জানান, ‘ঈদের দিন থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে প্রায় ৬ হাজার ২৫০ জন দেশি-বিদেশি পর্যটক এসেছেন। এখান থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ টাকা।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ওসি মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ঈদে পর্যটকদের নিরাপত্তায় সব পর্যটন স্পটে ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল জোরদার রয়েছে। সব সংস্থার সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে বিভিন্ন পর্যটন স্পট, হোটেল-রিসোর্টসহ জেলাজুড়ে দর্শনার্থীদের পদচারণা ছিল। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ তৎপর রয়েছে।’
এসএস/আরএন