লক্ষ্মীপুরের একেবারে উপকূলীয় জনপদ রায়পুর, রামগতি ও কমলনগর উপজেলা। এছাড়া সদর উপজেলার কিছু অংশও উপকূলীয় এলাকা। বিশাল মেঘনা নদীর কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই চারটি জনপদে প্রকৃতি যেন উদার হাতে বিলিয়েছে সৌন্দর্য।
অব্যাহত নদীভাঙনের শিকার রামগতির পৌর শহর চর আলেকজান্ডারের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে উত্তাল মেঘনা। উপজেলা পরিষদ ভবন থেকে মাত্র একশ গজ দূরে নদীর পাড়ে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ জলরাশি। একই চিত্র কমলনগর উপজেলার মাতাব্বরহাট, মতিরহাট এবং নাছিরগঞ্জের মেঘনার পাড়ে।
সদর উপজেলার মজু চৌধুরীর হাট এবং রায়পুরের উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের আলতাফ মাস্টারঘাট, হায়দরগঞ্জ এলাকার সাজু মোল্লার ঘাট—সবই মেঘনার তীরঘেঁষে। এসব এলাকার ভাঙন রোধে নির্মিত শক্ত বাঁধ এখন শুধু সুরক্ষাই দিচ্ছে না, তৈরি করেছে নতুন এক প্রাকৃতিক বিনোদনকেন্দ্র।
বাঁধের ওপর দাঁড়ালে যত দূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। জোয়ার-ভাটার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে কিনারে। নদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া বাতাসে ভেসে আসে নির্মল প্রশান্তি। পিনপতন নীরবতার মাঝে বাতাসের মৃদু শব্দ যেন মন জুড়িয়ে দেয় আগত দর্শনার্থীদের।
বিকেল গড়ালে পশ্চিম আকাশে রক্তিম সূর্যাস্ত আর নদীর ঢেউ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অপার্থিব দৃশ্যপট। সোনালি আলো নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। প্রকৃতির এমন রূপ কাছ থেকে দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন হাজারো মানুষ। ঈদের ছুটিতে এসব স্পটে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়েছে।
নদীর পাড়ে জেগে ওঠা নতুন বালুর বেলাভূমি, ঢেউয়ের ছন্দ, জলের মিষ্টি শব্দ—সব মিলিয়ে দর্শনার্থীরা খুঁজে পান অন্যরকম এক প্রশান্তি। বাতাসের দোলায় শরীর ও মন জুড়িয়ে যায় মুহূর্তেই। অনেকের কাছেই এটি এখন ‘স্বল্প খরচে স্বর্গীয় ভ্রমণ’।
এ অঞ্চলে আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ ছুটে আসছেন এখানে। ঈদকে ঘিরে উৎসবের আমেজে প্রাণচাঞ্চল্য বেড়েছে কয়েকগুণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসুরা ভিড় করছেন মেঘনার পাড়ে। কেউ নৌকাভ্রমণে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউবা পরিবার নিয়ে ছবি তুলছেন বালুচরে। শিশুদের উচ্ছ্বাস আর বড়দের স্বস্তি—সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
মেঘনার পাড়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা বলেন, জেলা শহরে ভালো কোনো বিনোদনকেন্দ্র নেই। সিনেমা হলগুলোও বহু বছর ধরে বন্ধ। শহরের একঘেয়ে জীবন থেকে বের হয়ে নদীর পাড়ে এসে দারুণ স্বস্তি লাগছে। এখানকার প্রকৃতি সত্যিই মন ভরিয়ে দেয়।
তারা আরও বলেন, জেলায় ভালো কোনো পার্ক নেই। ঈদে বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয় না। মেঘনার পাড়ই এখন প্রধান বিনোদনস্থল। তবে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা ও অবকাঠামো আরও উন্নত করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জরুরি।
রামগতি-কমলনগর বাঁচাও মঞ্চের আহ্বায়ক আবদুস সাত্তার পালোয়ান বলেন, গত ৩০ বছরে মেঘনা উপকূলের ভাঙনে বিলীন হয়েছে হাজার হাজার মানুষের বাড়িঘর। সেই উত্তাল মেঘনা আজ অভিশাপ থেকে আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ঈদের আনন্দ পেতে এখানে ছুটে আসছে। এটি এক অন্যরকম গল্প। মেঘনা উপকূল এখন পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জেলা প্রশাসক এস. এম. মেহেদী হাসান বলেন, চারটি উপজেলার মানুষের কাছে মেঘনার পাড় এখন অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র। ঈদ উপলক্ষে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। ট্রলার ও স্পিডবোটে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
আরএইচ/আরএন