ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন আর আত্মীয়তার উষ্ণতা। কিন্তু একই সঙ্গে ঈদ মানেই দীর্ঘশ্বাস—ঘরমুখো মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া, টিকিট সংকট, লঞ্চঘাটে বিশৃঙ্খলা, আর সড়কে দুর্ঘটনার শঙ্কা। প্রতি বছর একই চিত্র যেন পুনরাবৃত্ত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি আমাদের নিয়তি, নাকি সুশাসন ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই চিত্র বদলানো সম্ভব?
এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে বিএনপি সরকার যে ২৬টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সম্প্রতি সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন— সড়ক, রেল ও নৌপথের সমন্বিত উদ্যোগে এবারের ঈদযাত্রা হবে ‘আরামদায়ক ও মনোরম’।
গত বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ তদারকি, মোবাইল কোর্ট, অতিরিক্ত ভাড়া রোধ, সদরঘাটে শৃঙ্খলা, স্পিডবোট নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ—সব মিলিয়ে পরিকল্পনাটি কাগজে-কলমে যথেষ্ট শক্তিশালী।
কিন্তু বাস্তবতার হচ্ছে বাংলাদেশে পরিকল্পনার ঘাটতি যতটা নয়, বাস্তবায়নের ঘাটতি তার চেয়ে অনেক বেশি।
ঈদযাত্রার দুর্ভোগের পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে।
প্রথমত, আমাদের পরিবহন অবকাঠামো জনসংখ্যার চাপের তুলনায় এখনও অপর্যাপ্ত। ঢাকা-কেন্দ্রিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ফলে রাজধানীতে বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস। ঈদের আগে কয়েক দিনের মধ্যে সেই বিপুল জনস্রোত একযোগে গ্রামে ফেরে। এই কেন্দ্রীভূত চাপ সামাল দেওয়ার মতো বহুমুখী ও বিকেন্দ্রীভূত পরিবহন ব্যবস্থা আমরা এখনো পুরোপুরি গড়ে তুলতে পারিনি।
দ্বিতীয়ত, সড়কনির্ভরতা অত্যধিক। রেল ও নৌপথ শক্তিশালী হলেও, সমন্বিত টিকিটিং, সময়নিষ্ঠতা ও যাত্রীসেবায় এখনও আধুনিকায়নের সুযোগ রয়েছে। সদরঘাটে শৃঙ্খলা রক্ষা ও কোস্টগার্ড-নৌপুলিশের নজরদারির ঘোষণা ইতিবাচক, তবে এটি ধারাবাহিক হতে হবে, কেবল উৎসবকেন্দ্রিক নয়।
তৃতীয়ত, অতিরিক্ত ভাড়া ও চাঁদাবাজি একটি সামাজিক-প্রশাসনিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা স্বাগতযোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো—অভিযোগ গ্রহণ, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হবে? মালিক-শ্রমিকদের অঙ্গীকারের পাশাপাশি ডিজিটাল টিকিটিং, ভাড়া তালিকা প্রকাশ, এবং অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থাকে কার্যকর না করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের সক্ষমতা নিয়ে জনমনে কৌতূহল আছে। অনেকে মনে করেন, ড. মুহাম্মদের ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার সাম্প্রতিক কয়েকটি ঈদে দৃঢ় ও স্থিতিশীল অবস্থান নিয়ে আস্থা অর্জন করেছে। যদি সেই প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও সমন্বয় ঈদযাত্রার মতো উচ্চ-চাপের ব্যবস্থাপনায় প্রয়োগ করা যায়, তবে পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান কমানোই হবে আসল পরীক্ষা।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে- উন্নত দেশগুলোতে উৎসবকেন্দ্রিক ভ্রমণ ব্যবস্থাপনায় আগাম স্লট বরাদ্দ, ডিজিটাল মনিটরিং, লাইভ ট্রাফিক আপডেট, এবং কঠোর ভাড়া নিয়ন্ত্রণ কার্যকর থাকে। আমাদেরও প্রয়োজন তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত কমান্ড সেন্টার, যেখানে সড়ক, রেল ও নৌপথের রিয়েল-টাইম তথ্য একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে যাত্রীদের সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
গার্মেন্টস খাতে আগাম ছুটি দেওয়ার অনুরোধ একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। এতে জনস্রোতের চাপ বিভাজিত হতে পারে। তবে এটি বাস্তবে কতটা মানা হবে, তা নজরদারির বিষয়।
একই সঙ্গে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ও ঘাট এলাকায় অস্থায়ী মেডিকেল টিম, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা দরকার—কারণ নিরাপদ যাত্রা মানে কেবল দুর্ঘটনামুক্ত যাত্রা নয়, স্বাস্থ্যসম্মত যাত্রাও। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহিতা। যে কর্মকর্তা বা সংস্থা দায়িত্বে অবহেলা করবে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা না থাকলে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হয় না।
একবার-দুবার কঠোর অভিযান নয়, বরং একটি সংস্কৃতিগত পরিবর্তন জরুরি—যেখানে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া সামাজিকভাবে লজ্জাজনক ও আইনগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ঈদযাত্রা আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতার একটি বার্ষিক পরীক্ষার মতো। এই পরীক্ষায় সফলতা মানে কেবল কয়েক দিনের স্বস্তি নয়; এটি প্রশাসনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নাগরিক অংশগ্রহণের সম্মিলিত সাফল্যের প্রতীক। সরকার ২৬টি সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এখন প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ মনিটরিং এবং নাগরিক সহযোগিতা।
বাংলাদেশের ঈদযাত্রার দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ বদলানো অসম্ভব নয়। তবে এটি সম্ভব হবে কেবল তখনই, যখন পরিকল্পনা হবে তথ্যভিত্তিক, বাস্তবায়ন হবে সুশৃঙ্খল এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। নতুন সরকার যদি এই তিনটি বিষয়ে দৃঢ় থাকে, তবে ঈদযাত্রা কেবল ভোগান্তির নয়, বরং নিরাপদ, আরামদায়ক ও আনন্দময় অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে। প্রযুক্তিগত ও নিয়মিত তদারকি থাকলে ভিড় ও অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা মোটেও কঠিন কাজ নয়। এজন্য আমাদের প্রয়োজন সদিচ্ছা, পরিকল্পনা এবং দৃঢ় বাস্তবায়ন। তাহলেই কেবল সকলের জন্য ঈদযাত্রা হয়ে উঠতে পারে আনন্দের অনুষঙ্গ।
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com