চা-বাগান অধ্যুষিত মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর। নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর চা-শ্রমিকদের জীবনঘনিষ্ঠ এই জনপদে প্রতিদিন থামে আন্তঃনগর ট্রেন। যাত্রীরা ওঠেন-নামেন, প্ল্যাটফর্মে ভিড় জমে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, যেখানে ট্রেনের নিয়মিত যাত্রাবিরতি আছে—সেখান থেকেই মেলে না কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের টিকিট! ফলে কুমিল্লা, লাকসাম ও ফেনীগামী যাত্রীদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করে সরাসরি চট্টগ্রামের টিকিট কিনতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ও উদয়ন এক্সপ্রেস নিয়মিত থামে শমশেরনগর রেলওয়ে স্টেশন-এ। অথচ এই স্টেশন থেকে কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশন, লাকসাম রেলওয়ে স্টেশন ও ফেনী রেলওয়ে স্টেশন—এই তিন গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনের কোনো টিকিট বরাদ্দ নেই।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রায় ২০ বছর আগে কুমিল্লার গোমতি এলাকায় পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের একটি দুর্ঘটনায় কয়েকটি বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন বগি সংকটের কারণে শমশেরনগর থেকে কুমিল্লা, লাকসাম ও ফেনীর টিকিট বরাদ্দ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু ট্রেন এখন পূর্ণ বগি নিয়েই চলাচল করছে। তবু সেই ‘সাময়িক’ সিদ্ধান্ত আজও বহাল। যাত্রীদের প্রশ্ন—দুর্ঘটনার ক্ষত সেরে গেছে, তাহলে টিকিট বরাদ্দের ক্ষত কেন রয়ে গেল?
শমশেরনগর থেকে শোভন চেয়ার ভাড়া—কুমিল্লা: ২৩০ টাকা, লাকসাম: ২৬০ টাকা, ফেনী: ২৮০ টাকা।
কিন্তু টিকিট না থাকায় যাত্রীদের বাধ্য হয়ে সরাসরি চট্টগ্রামের টিকিট (৩৮৫ টাকা) কিনতে হচ্ছে। অর্থাৎ গন্তব্যের চেয়ে অনেক দূরের ভাড়া গুনতে হচ্ছে কেবল বরাদ্দ জটের কারণে।
অন্যদিকে, শমশেরনগরের আগের স্টেশন কুলাউড়া ও পরের স্টেশন শ্রীমঙ্গল থেকে এসব গন্তব্যের টিকিট পাওয়া যায়। এতে বৈষম্যের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শমশেরনগর চা-শিল্প অধ্যুষিত এলাকা। প্রতিদিন শত শত মানুষ কুমিল্লা, লাকসাম ও ফেনীতে ব্যবসা, চিকিৎসা ও শিক্ষার প্রয়োজনে যাতায়াত করেন। নিয়মিত টিকিট বরাদ্দ দিলে রেলওয়ের রাজস্বই বাড়বে—কমবে না। তাহলে কেন এই দীর্ঘসূত্রতা? প্রশাসনিক উদাসীনতা, নাকি সফটওয়্যারভিত্তিক কোটা ব্যবস্থার জট?
যাত্রীসেবার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত কবে? যেখানে ট্রেন থামে, সেখানে টিকিট না থাকার বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়—এটি যাত্রীসেবার প্রশ্ন। ঈদ সামনে রেখে দ্রুত সমাধান না এলে ভোগান্তি আরও বাড়বে।
ট্রেনযাত্রী শিক্ষক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘ট্রেন যখন থামে, যাত্রী ওঠানামা করেন, তখন টিকিট দিতে সমস্যা কোথায়? এটা কেমন নিয়ম ?
দুর্ভোগের কথা জানিয়ে নিয়মিত কুমিল্লাগামী যাত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, বর্তমানে ট্রেনের টিকিট পাওয়া যেন সোনার হরিণের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ১০ দিন অপেক্ষা করেও টিকিট পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে অনেক সময় বেশি দামে দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে টিকিট কিনতে হয়। না হলে ট্রেনের টিটিদের ‘ম্যানেজ’ করে যাত্রা করতে হয়। এ অবস্থার দ্রুত সমাধান চান তিনি।
টিকিট সংকটের প্রতিবাদে গত ৫ আগস্ট ছাত্রদের নিয়ে আন্দোলন করেন কমলগঞ্জ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ মিয়া। তিনি বলেন, সিলেট রেলপথ দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার। এ পথে প্রায়ই ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে, কিন্তু এরপরও রেলপথের উন্নয়ন হয়নি। বিশেষ করে সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রাম আন্তনগর ট্রেনের টিকিট পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আন্দোলন করা হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শমশেরনগর স্টেশন মাস্টার জয়ন্ত রায় তিন স্টেশনে টিকিট বরাদ্দ না থাকার কথা স্বীকার করে বলেন,‘ঠিক কী কারণে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বরাদ্দ দিচ্ছে না, তা আমি বলতে পারবো না। তবে যাত্রী চাহিদা যথেষ্ট আছে। বরাদ্দ দেওয়া হলে সুবিধা হবে।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আসন্ন ঈদে যাত্রী ভোগান্তি আরও বাড়বে।’
অন্যদিকে, শমশেরনগরের আগের স্টেশন ভানুগাছ রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার গৌড় প্রসন্ন দাস পলাশ জানান, ‘টিকিট সংকটের বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।’
এসআর