ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
ভালোবাসা বনাম ধর্ম: আইনের চোখে সমাধান বিশেষ বিবাহ আইন!
✎ এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:৪৪ পিএম
ফাইল ছবি
X

ফাইল ছবি

অর্ণব একজন বাংলাদেশি মুসলিম এবং সুস্মিতা একজন বাংলাদেশি হিন্দু। তারা দু'জনেই প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিক্ষিত। তারা একে অপরকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু কেউই নিজের ধর্ম পরিবর্তন করতে রাজি ছিলেন না। অবশেষে তারা ১৮৭২ সালের বিশেষ বিবাহ আইনের অধীনে তারা নিজ নিজ ধর্ম বজায় রেখেই বিয়ে করেন।

বিশেষ বিবাহ আইনের মূল উদ্দেশ্যই হলো- নিজ নিজ ধর্ম পালন করেও বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। 

উচ্চ আদালত বলেছেন, বিয়ের জন্য কাউকে তার আজন্মলালিত বিশ্বাস বা ধর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য করা সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

বাংলাদেশের নাগরিকের সাথে বিদেশি নাগরিকের বিয়ের বিষয়টি মূলত ১৮৭২ সালের বিশেষ বিবাহ আইন Special Marriage Act দ্বারা পরিচালিত হয়। প্রয়োজন বিদেশি নাগরিকের বৈধ পাসপোর্ট এবং বাংলাদেশে প্রবেশের সময়কার ভিসার ফটোকপি। সাথে তিনি বর্তমানে অবিবাহিত, তালাকপ্রাপ্ত এর স্বপক্ষে লিগ্যাল সার্টিফিকেট বা একটি হলফনামা।

আর বাংলাদেশের কোনো সরকারি কর্মচারী যদি বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই সরকারের (সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়) পূর্ব অনুমতি নিতে হবে। 'গণকর্মচারী (বিদেশি নাগরিকের সহিত বিবাহ) আইন, ২০১৫' অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি থাকে। বিয়ের পর ম্যারেজ সার্টিফিকেটটি আইন মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়ন করিয়ে নেওয়া জরুরি, বিশেষ করে যদি আপনারা বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। 

উল্লেখ্য, বিয়ের পর নির্দিষ্ট সময় বাংলাদেশে বসবাসের পর বিদেশি জীবনসঙ্গী নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন।

অর্ণব এবং সুস্মিতা বিশেষ বিবাহ নিবন্ধকের সাথে যোগাযোগ করেন। আইন অনুযায়ী, তারা বিয়ের ১৪ দিন আগে নিবন্ধকের কাছে একটি লিখিত নোটিশ জমা দেন। বিয়ের দিন তারা এই মর্মে ঘোষণা দেন যে, তারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী এবং এই আইনের অধীনে বিয়ে করতে ইচ্ছুক। তিন জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে তারা বিশেষ বিবাহ রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেন এবং একটি স্পেশাল ম্যারেজ সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন।

বিয়ের খবর জানাজানি হলে সুস্মিতার পরিবার ক্ষুব্ধ হয়। তারা স্থানীয় থানায় অর্ণবের বিরুদ্ধে 'অপহরণ' এবং 'জোরপূর্বক ধর্মান্তর'-এর অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করে। পুলিশ অর্ণবকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাক দেয় এবং সুস্মিতার পরিবার তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

অর্ণব ও সুস্মিতা তাদের নিরাপত্তার জন্য এবং মামলা বাতিলের দাবিতে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। তাদের আইনজীবী আদালতে বিয়ের মূল 'স্পেশাল ম্যারেজ সার্টিফিকেট' এবং উভয় পক্ষের জাতীয় পরিচয়পত্র পেশ করেন।

আদালত দেখেন যে, অর্ণব ও সুস্মিতা দু'জনেই প্রাপ্তবয়স্ক। তারা স্বেচ্ছায় এবং স্বজ্ঞানে বিশেষ বিবাহ আইনের অধীনে বিয়ে করেছেন, যা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন দ্বারা স্বীকৃত। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যেহেতু তারা বিশেষ বিবাহ আইনে বিয়ে করেছেন, তাই এখানে 'অপহরণ' বা 'জোরপূর্বক ধর্মান্তর'-এর অভিযোগ ভিত্তিহীন। আদালত পুলিশের দায়ের করা মামলাটি বাতিল (কোয়াশ) করে দেন এবং স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেন যেন এই দম্পতিকে কেউ হয়রানি না করে।

কাজেই বিশেষ বিবাহ আইনের সার্টিফিকেটটি একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করে। এটি প্রমাণ করে যে বিয়েটি মোটেই অবৈধ নয়। ধর্ম পরিবর্তনের চাপ নেই। এই আইনের মাধ্যমে সুস্মিতা তার হিন্দু ধর্ম এবং অর্ণব তার ইসলাম ধর্ম বজায় রাখতে পেরেছেন।

উচ্চ আদালতের নজির অনুযায়ী, বিশেষ বিবাহ আইনে বিয়ে করলে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ধর্মীয় আইন আর কার্যকর থাকে না। এ ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫ কার্যকর হবে। উচ্চ আদালত নিশ্চিত করেছে যে, এই বিয়ের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানরা তাদের বাবা-মায়ের সম্পত্তিতে পূর্ণ আইনি অধিকার পাবে, যা কোনো ধর্মীয় জটিলতায় আটকে থাকবে না।

উচ্চ আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ব্যক্তির পছন্দ এবং জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্র বা সমাজ কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে তার পছন্দের মানুষের সাথে আইনি প্রক্রিয়ায় সংসার করতে বাঁধা দিতে পারে না।

বিশেষ বিবাহ আইনের অধীনে দেওয়া ম্যারেজ সার্টিফিকেট আন্তর্জাতিক ভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী দলিল হিসেবে গণ্য হয়। বিদেশি নাগরিকের সাথে বিয়ের ক্ষেত্রে বা বিদেশের ভিসা আবেদনের সময় এই সার্টিফিকেটটি খুব সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়, কারণ এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা স্বীকৃত।

কাজেই ভিন্ন ধর্মের বা ভিন্ন দেশের নাগরিকের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক সময় সামাজিক জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ বিবাহ আইনের অধীনে রেজিস্ট্রি করা থাকলে রাষ্ট্র আপনাদের সুরক্ষা প্রদান করে এবং কেউ এই বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। 
ই-মেইল: [email protected]

এমএ


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝